Home / প্রবন্ধ / রোববারের লেখা / চন্দননগরে ফরাসি সংস্কৃতির হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো

চন্দননগরে ফরাসি সংস্কৃতির হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো

ফরাসি আমলের স্থাপত্য ‘The Sleepy Hollow’

মুকুট তপাদার

বিস্ময় জাগে এক-একটি জনপদের কথা। জ্ঞানসমুদ্র মন্থন করে অজানা কত ইতিহাস সেইসব জনপদে ভেসে বেড়ায়। বিদেশি শাসন যেভাবে সাধারণ মানুষের উপর চেপে বসেছিল সেই প্রক্রিয়া নিয়ে আজও মানুষের প্রশ্ন ওঠে।
ফরাসডাঙ্গার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ফরাসি স্থাপত্যের গৌরবময় ইতিহাস। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে সমৃদ্ধ এই শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং বাণিজ্যের সেই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়কে আসুন খুঁজে দেখি। এই সফরনামায় আপনারাও অংশীদার হন। আজকের সময়ের আড়ালে কত কি হারিয়ে যায়, তার উৎস-সন্ধানে এবার ফিরে দেখা।

বাংলার প্রধান এক বাণিজ্য কেন্দ্র চন্দননগর। ফরাসিরা বলতেন ‘চান্দেরনগর’। অর্থাৎ চাঁদের নগর। গঙ্গা আবার এখানে চন্দ্রাকার। তবে, ঐতিহাসিক সুকুমার সেন মনে করতেন, এখানে প্রাচীণ চণ্ডী মন্দির থাকার জন্য জায়গাটির নাম হয়েছে চন্দননগর। ফরাসিদের অধিকারের পর এখানকার নাম হয় ফরাসডাঙ্গা। ঐতিহাসিক এই শহরে প্রবেশের জন্য ভদ্রেশ্বর ও চুঁচুড়ার দিকে দুটি তোরণ রয়েছে। ফরাসি স্থাপত্যের এই প্রবেশদ্বার দুটিতে খোদাই করা আছে ফরাসিদের মূল মন্ত্র -‘লিবার্তে, ইগালিতে ও ফ্রাতার্নিতে’, যার অর্থ মুক্তি, সাম্য আর ভ্রাতৃত্ব। চন্দননগর শহরটি ফরাসি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করছে। প্রবেশদ্বারটির আরেক নাম ‘লিবার্টি গেট’। ১৯৩৭ সালের ১৪ জুলাই বাস্তিল দিবস বা ফরাসি বিপ্লবের স্মৃতিতে নির্মিত হয়েছিল।

গভর্নর জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লের বাসভবন

বাংলায় বস্ত্রশিল্প ফরাসডাঙ্গার ভেতর দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তো। এখানকার অতি সূক্ষ্ম ও মিহি সুতির ধুতির খুব নাম ছিল। তাছাড়া চিনি, লবণ, মশলা, কারুশিল্প বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানি করা হতো।

ইতিহাস আর কিংবদন্তি আজকের চন্দননগরে এক রকম মিলেমিশে গিয়েছে। তবু পাথুরে প্রমাণ প্রয়োজন হয়। এই অঞ্চলের মাটির সাথে জড়িয়ে রয়েছে পৌরাণিক কাহিনী। ধনপতি তনয় শ্রীমন্ত সওদাগর যখন সপ্তডিঙা নিয়ে বাণিজ্যে বের হতেন, তখন এই স্থানে দেবী চণ্ডীর আশীর্বাদ পেয়েছিলেন। নোঙর ফেলেছিলেন এই পুণ্যভূমিতে। শ্রীমন্ত সওদাগর যে চণ্ডী (বোড়াইচণ্ডী) তলায় পুজো দিয়ে বাণিজ্যে গিয়েছিলেন সেই জায়গাটির নাম বোড়ো। কালক্রমে এই বোড়ো গ্রামের সংলগ্ন গোন্দলপাড়া এবং খলিসানি এই তিন প্রধান গ্রাম নিয়ে গড়ে ওঠে আজকের আধুনিক চন্দননগর শহর। গঙ্গার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলটি মনে করিয়ে দেয় বাংলার নৌ-বাণিজ্যের কথা আর মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস। বোড়োয় আজও পূজিত হন দেবী বোড়াইচণ্ডী।

শ্রীমন্ত সওদাগর পূজিত বোড়াইচণ্ডী

মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মামা শায়েস্তা খাঁর থেকে বাণিজ্য করার ছাড়পত্র পেয়ে ফরাসিরা ভদ্রেশ্বরের কাছে তাদের প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন। কালক্রমে, ১৬৯৬ সালের আশেপাশে এই জনপদটি সুসংগঠিত হয়। মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে থাকায় প্রথম দিকে এই এলাকাগুলো বেশ সুরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত লাভ করেছিল। তবে ইউরোপীয় শক্তির দ্বন্দ্বে ও ক্ষমতার লড়াইয়ে বেশ কয়েকবার ইংরেজরা এই ফরাসি শহরটি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। ১৭৬৯ ও ১৮১৬ সালে ফরাসিরা এই উপনিবেশটি ইংরেজদের হাত থেকে ফের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ঐতিহাসিক সূত্রে, ফরাসি আমলে গভর্নর জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লের শাসনকালকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, বাণিজ্যিক প্রসার এবং প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে এই সময়টিকে শহরের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ বলা হয়েছে।

হুগলী নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত চন্দননগর তার অনন্য ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যকলার জন্য বিখ্যাত। এখানকার ফরাসি স্থাপত্য শৈলী ভারতীয় ও ইউরোপীয় মিশ্র সংস্কৃতির এক অপূর্ব নিদর্শন, যা আজও শহরটিকে একটি আলাদা নান্দনিক রূপ দেয়। নদীর পাড় ঘেঁষে স্ট্র্যান্ড ছড়িয়ে কয়েক পা এগোলেই চন্দননগর মিউজিয়াম অর্থাৎ ডুপ্লের বাসভবন। বিশাল প্রবেশদ্বার, বেশ উঁচু ছাদ, চওড়া বারান্দা, লম্বা স্তম্ভ, খড়খড়ি দেওয়া জানলা, বিরাট সব ঘর জুড়ে ফরাসি রীতির মিশ্রণ চোখে পড়ে। রেজিস্ট্রি বিল্ডিং, রানি ঘাটের কাছে চন্দননগর কোর্টহাউস, পাতাল বাড়ি, ডুপ্লে কলেজ একইরকম প্রায় দেখতে। ফরাসি আমলে গ্রীষ্মপ্রধান আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে এগুলো এমনভাবে তৈরি হয়েছিল। চন্দননগরে সেক্রেড হার্ট গির্জাটি প্যারিসের নটর ড্যাম গির্জার সঙ্গে যেন মিল পাওয়া যায়। গির্জার দেওয়াল, রঙিন কাঁচ আর স্তম্ভগুলো বহু স্মৃতি বহন করছে। ফরাসি শহরের বহু ঘটনার পর্যবেক্ষক পুরনো এই সকল স্থাপত্য শৈলীগুলো।

(চলবে)

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *