মুকুট তপাদার
ইতিহাসের সরণি ধরে মুর্শিদাবাদের কাটরা মসজিদ শুধুই কি এক অতীতের ইমারত? নাকি বরং বহু ঘটনার আড়ালে এক ভাঙাগড়ার নীরব সাক্ষী। নবাবের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী স্থপতির অজানা অধ্যায় এই ইমারতের সঙ্গে জড়িয়ে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর নির্দেশে তাঁর এক বিশ্বস্ত কর্মী মুরাদ ফারাজ খান এই সুবিশাল কাটরা মসজিদ নির্মাণের দায়িত্ব পান। কিন্তু এক বছরের মধ্যে এই বিশাল নির্মাণ কাজ শেষ করার সময়কালে মুরাদ ফারাজ যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, তা ছিল চরম বিতর্কিত।
ইঁটের জোগান কম থাকায় তিনি আশেপাশের বহু স্থাপত্যের উপকরণ ও ধ্বংসাবশেষ দিয়ে মসজিদের নির্মাণ কাজ করতে শুরু করেন। নিশ্চিত ভাঙনের হাত থেকে সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিল দাহাপাড়ার ঐতিহাসিক কিরীটেশ্বর মন্দির। যা বর্তমানে বেস্ট ট্যুরিজম ভিলেজ। সতীর ৫১টি পীঠের অন্যতম এই মন্দির। সতীর কিরীট এখানে পড়েছিল। তৎকালীন দেওয়ান দর্পনারায়ণ রায়ের হস্তক্ষেপে প্রচুর অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে এই ধর্মীয় স্থানটি রক্ষা পায়।
নাটোরের রানি ভবানী এই মন্দিরের সংস্কার ও পূজার্চনার ব্যবস্থা করেছিলেন। যদিও অনেক ঐতিহাসিক ‘তারিখ-ই-বাংলা’ গ্রন্থের সূত্র ধরে মনে করেন, মন্দির ভাঙার এই ঘটনা কিছুটা অতিরঞ্জিত হতে পারে।
তবে সেই মুরাদের প্রভাব কখনোই বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মুরাদ নবাবের সময়কালে বহু মানুষের ওপর শোনা যায় নির্মম ব্যবহার করেন। মুর্শিদকুলি খাঁর পরবর্তী নবাব, তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন খাঁ মসনদে বসেই এই মুরাদ ফারাজকে তাঁর কৃতকর্মের জন্য প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেন। কাটরা মসজিদের এই ইতিহাসের সঙ্গে সেখানে আজও টিকে আছে এই অদ্ভুত ঘটনার কথা।

চিত্রশিল্পী উইলিয়াম হজেস এর আঁকা কাটরা মসজিদের চিত্র
চিত্রশিল্পী উইলিয়াম হজেস তাঁর লিখিত বইয়ে মুর্শিদাবাদের এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের বিবরণ দিয়েছিলেন। একে মুসলিম শিক্ষার এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেন। ১৮৭১ সালে তাঁর বাংলা ভ্রমণের সময় এই স্থাপত্য তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৮৯৭ সালের এক ভূমিকম্পে এই মসজিদটির বিশাল একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কাটরা মসজিদের দেওয়ালে পাথরে খোদিত একটি প্রাচীন ফার্সি লেখা রয়েছে। যেখানে লেখা:
“আরবের মহম্মদ উভয় জগতের গৌরব, যে ব্যক্তি তাঁর দ্বারের ধূলি নয় তার মস্তকে ধূলি বৃষ্টি হোক।”
এই লেখাটি কাটরা মসজিদের ওপরে নবাবের নির্দেশে মুরাদ বসিয়েছিল। আর ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে স্থাপত্যের দিক দিয়ে কাটরার এই ঐতিহাসিক নিদর্শন অনন্য।
তথ্যসূত্র: সিলেক্ট ভিউজ ইন ইন্ডিয়া, উইলিয়াম হজেস। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া।
ছবি: লেখক









