অমল মাজি, দুর্গাপুর:
শিল্পনগরী দুর্গাপুর একসময় কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের প্রতীক ছিল। কিন্তু আজ সেই শিল্পাঞ্চলের এক বড় অংশের বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্পঞ্জ আয়রন সহ একাধিক লোহা, সীসা, কার্বন কারখানার কালো ধোঁয়া, কয়লার সূক্ষ্ম ধূলিকণা ও লাগামছাড়া বায়ুদূষণে কার্যত শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে উঠেছে। সুস্থ পরিবেশে বেঁচে থাকার সাংবিধানিক অধিকার যেন প্রতিদিনই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, দিনের বিভিন্ন সময়ে কারখানার চিমনি থেকে নির্গত ঘন কালো ধোঁয়ায় চারপাশ ঢেকে যায়। ঘরবাড়ি, রাস্তা, গাছপালা, এমনকি পানীয় জলের উৎস পর্যন্ত কালো ধুলোর আস্তরণে ঢেকে যায়। শিশু, প্রবীণ এবং শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। অনেকের অভিযোগ, জানালা খুলে রাখা যায় না, কাপড় শুকোতে দিলেই তা কালো ধুলোয় ভরে যায়। বাড়ির উঠোন কালো ধুলোয় ভরে যায়।
প্রশ্ন উঠছে, দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন, পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত এবং নজরদারির ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বারবার একই অভিযোগ কেনও সামনে আসছে? যদি দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে কেন?
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পঞ্জ আয়রন সহ বিভিন্ন দূষণ সৃষ্টিকারী শিল্পে আধুনিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির বাধ্যতামূলক ব্যবহার, নিয়মিত নির্গমন পরীক্ষা এবং অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। শিল্পের বিকাশ যেমন জরুরি, তেমনি মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তনের পরও দূষণ সমস্যার দৃশ্যমান সমাধান মেলেনি। একই সঙ্গে রাজ্যে শাসক দল হিসেবে বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। বহু বাসিন্দার দাবি, শিল্প দূষণের মতো জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিজেপির পক্ষ থেকে ধারাবাহিক আন্দোলন বা জোরালো প্রতিবাদ খুব একটা চোখে পড়েনি। মানুষের প্রত্যাশা, শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মতো বিষয়েও সব রাজনৈতিক দলের সমান সক্রিয়তা থাকা উচিত।
অন্যদিকে প্রশাসনের কাছেও মানুষের প্রশ্ন, দূষণকারী শিল্পগুলির বিরুদ্ধে নিয়মিত পরিদর্শন, নির্গমন পরীক্ষা এবং আইনানুগ ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হচ্ছে? যদি নেওয়া হয়, তাহলে তার বাস্তব ফল সাধারণ মানুষ কেন অনুভব করতে পারছেন না?
দুর্গাপুরবাসীর একটাই আবেদন, শিল্প চলুক, কর্মসংস্থান বাড়ুক, কিন্তু তার বিনিময়ে মানুষের শ্বাস নেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই, যখন শিল্পের পাশাপাশি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে। এখন দেখার, প্রশাসন ও সব রাজনৈতিক দল এই জনদাবির প্রতি কতটা গুরুত্ব দেয়।










