Home / প্রবন্ধ / রোববারের লেখা / হিউয়েন সাঙের ভ্রমণ বৃত্তান্তে বঙ্গভূমি

হিউয়েন সাঙের ভ্রমণ বৃত্তান্তে বঙ্গভূমি

মুকুট তপাদার

চীনা পরিব্রাজক ও বৌদ্ধ পণ্ডিত হিউয়েন সাঙ। তাঁর ভ্রমণগ্রন্থর সকল লেখা কৌতূহল জাগায়। জিজ্ঞাসার পাত্র প্রসারিত করে। যে পাত্র তথ্যপত্রে ভরা। আজও গবেষকরা বৃহত্তর ভারতের কথা জানার জন্য সেখান থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে চলেছেন। ব্যাপ্ত ভূখণ্ডতে তাঁর পরিক্রমা নানা তথ্য উত্থাপিত করে।

হিউয়েন সাঙ তার বিবরণে ৮২টি রাজ্যের কথা বলেছেন। সিংহল সহ এই সবকটি রাজ্য ছিল। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারত সীমানায় পদার্পণ করেন। ৬৩৬ এ মগধে ও নালন্দা মহাবিহারে আসেন। এরপর তিনি পুণ্ড্রবর্ধন হয়ে কামরূপ, সমতট তাম্রলিপ্ত ও কর্ণসুবর্ণতে আসেন। সারা ভারত ঘুরে বেড়ানোর কালে হিউয়েন সাঙ অনেক শহর, পুরনো রাজধানী, অনেক গ্রাম এমনকি একেকটি রাজ্যকেও জনবিরল অবস্থায় দেখেছেন। এমনকি দেশের চোর লুটেরাদেরকেও তিনি ভ্রমণ বৃত্তান্তে উল্লেখ করেছেন। আবার এদেশের মাটির উর্বরতা, প্রচুর শস্য, ফুল ফলের সমৃদ্ধি দেখে অভিভূত হয়েছেন।

হিউয়েন সাঙ এর যাত্রায় এই বঙ্গদেশের অধিবাসীদের কথা, জ্ঞানচর্চা, শ্রমণ, ব্রাহ্মণ, মঠ, দেবমন্দির ও সাম্রাজ্যের কথা উঠে আসে। বর্তমানে বৃহত্তর ও কুমিল্লা, নোয়াখালী, ঢাকা ও ২৪ পরগনা জেলার অনেকখানি অঞ্চল জুড়ে ছিল সমতট। সাগরকূলে থাকা রাজ্যটি নিয়ে হিউয়েন সাঙ বিবরণ দিয়েছিলেন, তখন নাম ‘সন-মো-ত-চ’। দেখেছিলেন শস্যের প্রচুর ফলন। এখানকার মানুষ পরিশ্রমী। জ্ঞানচর্চা হয়। প্রায় তিরিশটি সংঘারাম, দুই হাজার ভিক্ষু, একশোটি দেবমন্দির, শহরের বাইরে অশোকের নির্মিত একটি স্তূপ ও বুদ্ধমূর্তি দেখতে পেয়েছিলেন। এটিও উল্লেখ করেন যে, সাগরকূল ধরে এগোলে শ্রীক্ষেত্র রাজ্যে আসা যায়।

আজকের তমলুক বা তাম্রলিপ্তিতে হিউয়েন সাঙ আসেন। তখন এর নাম তান-মো-লি-তি। এই রাজ্যের ভূমি নিচু বর্ণনা দেন। তবে লোকজনেরা বেশ পরিশ্রমী। তিনি এখানে পঞ্চাশটি দেবমন্দির দেখেছিলেন। এই শহরে অশোকের গড়া একটি স্তূপ দেখেন। আর দেখেছেন দশটি সংঘারাম। সম্রাট অশোকের পুত্র ও কন্যা তাম্রলিপ্তি থেকে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য সিংহল যাত্রা করেন।

হিউয়েন সাঙ সবচেয়ে স্পষ্ট যে জায়গাটি নিয়ে উল্লেখ করেন সেটি কর্ণসুবর্ণ। যার নাম ছিল তাঁর বর্ণনাতে ‘কিএ-লো-ন-সু-ফ-ল-ন’। কর্ণসুবর্ণ বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা শশাঙ্কের রাজধানী। শশাঙ্ক সেইসময় মহেশ্বরের মূর্তি স্থাপনের আদেশ দেন বুদ্ধদেবের মূর্তি সরিয়ে। বৌদ্ধধর্মানুরাগী রাজ্যবর্ধনকে শশাঙ্ক হত্যা করেছিলেন। কর্ণসুবর্ণ ছিল আজকের মুর্শিদাবাদ জেলার রাজবাড়ীডাঙ্গায়। হিউয়েন সাঙ এখানে রক্তমৃত্তিকা মহাবিহারের পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দেন। পঞ্চাশটি দেব মন্দিরের কথা তিনি বলেছিলেন। বর্ণনায় বলেন, এখানে ফুলের চাষ খুব ভালো হয়। দশটি সংঘারাম আছে আর তাতে দুই হাজার মত ভিক্ষু থাকেন। এই স্থানে বুদ্ধদেব এসে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। সেখানেই অশোকের একটি বিহার নির্মিত।

আজকের রংপুর ও পশ্চিম দিনাজপুরের বেশ কিছু অঞ্চল নিয়ে ছিল পুন্ড্রবর্ধন। হিউয়েন সাঙ এখানকার বর্ণনায় অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্বের মূর্তির সঙ্গে একটি বিহারের কথা বলেছিলেন। এখানে রাজা অশোকের একটি স্তূপ দেখেছিলেন। পুন্ড্রবর্ধনে মহাযান ও হীনযান সম্প্রদায় দুয়েরই বর্ণনা দিয়েছিলেন। পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের ভ্রমণ বৃত্তান্ত প্রাচীন বাংলার মাটি, ধর্ম ও সংস্কৃতির বিষয়ে গবেষকদের পিপাসা মিটিয়ে চলেছে এক অনন্য আলোয়।

তথ্যসূত্র:
১)Faxian. A Record of Buddhist Kingdoms. Tr. James Legge, 1886
২)প্রেমময় দাশগুপ্ত

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *