দুর্গাপুর: শিল্পনগরীর রাজনীতিতে আবারও বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। প্রাক্তন তৃণমূল নেতা বিশ্বনাথ পাড়িয়াল ১৮ এপ্রিল বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে দলবদল এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কৌশলের জন্য পরিচিত এই নেতার এই পদক্ষেপকে অনেকেই বিজেপির সর্বনাশ দেখছেন।
এমনিতেই বিদায়ী বিজেপি বিধায়ক লক্ষণ ঘোরুই – এর গত পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট অধিকাংশ বিজেপি কর্মী সমর্থক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে লক্ষণের কৌশল, বিশ্বনাথকে বিজেপিতে ঢুকিয়ে তার কাঁধে ভর করে বৈতরণী পার হওয়া।
১৯৯৭ সালে কংগ্রেসের কাউন্সিলর হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন বিশ্বনাথ পাড়িয়াল। পরবর্তীতে তৃণমূল-এ যোগ দিয়ে দ্রুতই দুর্গাপুরে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন। দলীয় নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি মমতা ব্যানার্জির এবং স্থানীয় স্তরে সাংগঠনিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন বলে অভিযোগ। তাঁর সময়েই স্ত্রী ও ঘনিষ্ঠদের কাউন্সিলর পদে প্রতিষ্ঠা করার অভিযোগও বারবার উঠেছে।
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল যখন অপূর্ব মুখার্জি’কে দুর্গাপুর পশ্চিম কেন্দ্রে প্রার্থী করে, তখনই সংঘাত চরমে ওঠে। দলীয় সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন এবং অধীর চৌধুরীর কৃপাতে বাম-কংগ্রেস জোট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেই নির্বাচনে তিনি জয়ী হন। যা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক কৌশল ও তৎকালীন রাজনৈতিক সমীকরণ তাঁর পক্ষে কাজ করেছিল।
জয়ের পর কংগ্রেসে থাকার প্রতিশ্রুতি (মুচলেকা) দিয়েও তিনি আবার তৃণমূলে ফিরে যান, যা রাজনৈতিক মহলে বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অনেকেই এটিকে “রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানি” ‘ ধান্দাবাজ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল নেত্রী বিশ্বনাথকে বিশ্বাস ও ভরসা করে প্রার্থী করেন। কিন্তু বিজেপির আনকোরা, ব্যক্তিগত ক্যারিশমাহীন নেতা লক্ষণ ঘোরুই – এর
কাছে পরাজিত হন। এই হার তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের পতনের ইঙ্গিত দেয় বলে বিশ্লেষকদের মত।

2016 সালে সিপিএমের সঙ্গে
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য, এই এলাকায় সিপিএমের প্রভাব বেশি। ২০১৬ সালে কংগ্রেস সিপিএম জোটে জেতার পর তৃণমূলে যোগ দেওয়া বিশ্বনাথকে কেউ মেনে নিতে পারেনি। তাই বিশ্বনাথকে গোহারান হারাতে, বেইমানির বদলা নিতে সিপিএমের ভোট ২০২১ সালে বিজেপির ঝুলিতে পড়ে, তাতেই বিজেপির লক্ষণ ঘোরুই জিতে যান।
এবার সেই বিদায়ী বিধায়ক লক্ষণ ঘোরুই এবং আর এস এস নেতা অচ্যুত হাজরা’র হাত ধরে বিজেপিতে যোগদান করলেন বিশ্বনাথ।
অনেকেই এটা বিজেপির সর্বনাশ হিসেবে দেখছেন।
এক্ষেত্রে যদি এবার নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হেরে যান, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। সেক্ষেত্রে আগামীদিনে লক্ষণ ঘোরুই – এর অবস্থা বিশ্বনাথ পারিয়ালের মতো “না ঘরকা না ঘাটকা” হতে পারে।
অন্যদিকে, যদি তৃণমূল পুনরায় রাজ্য ক্ষমতায় আসে তখন এই বিশ্বনাথ তৃণমূলে ঢোকার জন্য আবার চেষ্টা চালাতে কসুর করবে না, তৃণমূলে ফিরে গিয়েও বলবে বিজেপিতে যাওয়াটা ভুল হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো বিশ্বনাথ পাড়িয়াল নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন ভবিষ্যতেও করবেন।
বিশ্বনাথ পাড়িয়ালের রাজনৈতিক পথচলা পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনীতির একটি বড় ট্রেন্ডকে সামনে আনছে, দলবদল ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি। আদর্শের চেয়ে ক্ষমতা ও প্রভাব ধরে রাখার লড়াই এখানে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।
তাঁর বিজেপিতে যোগদান স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ালেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি কতটা প্রভাব ফেলবে তা ভবিষ্যত বলবে।
দুর্গাপুরের রাজনৈতিক সমীকরণে এই ঘটনা নতুন করে সমীকরণ বদলাতে পারে, এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।










