
মুকুট তপাদার
বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস। প্রতিবারের মতো ১৮ এপ্রিল পালিত হয়েছে। যার মূল উদ্দেশ্য একটাই সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যদের সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অতীতের নিদর্শনগুলো শুধুমাত্র ইতিহাসের অংশ নয়। বরং আত্মপরিচয় ও শিকড়ের টানকে বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন দেশ তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন, স্থাপত্য, শিল্পকলা রক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বর্তমান সময়ে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অবহেলার কারণে অনেক ঐতিহ্য ধ্বংসের মুখে এসেছে। তাই এসকল রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। শিক্ষা, সচেতনতা এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে হবে। বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস আমাদের সেই দায়িত্ববোধকে জাগিয়ে তোলে। ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসাকে বাড়ায়।
সম্রাট আকবরের হিন্দু সেনাপতি টোডরমল বাংলায় প্রথম জমি জরিপের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই জরিপের নাম ছিল ‘আসলি-জমা-তুমার’। আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরীতে এই জরিপের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছিলেন। বাংলা সুবাকে উনিশটি সরকার ও দুশো বিরাশিটি পরগনায় ভাগ করে দেন। আকবরশাহী মুদ্রায় সরকার-ই-সাতগাঁ এর খাজনা ছিল এক কোটি দুই লক্ষ তিরানব্বই হাজার ঊনসত্তর টাকা।
সেকালে সাতগাঁয়ের অন্তর্গত এই এলাকাতেই চুঁচুড়ার অবস্থান ছিল। ষোড়শ শতকের পর সরস্বতী নদীর পাড়ে সপ্তগ্রাম বন্দরের জৌলুস কমতে থাকে। ওই সময় বন্দর নগর হিসেবে চুঁচুড়া গুরুত্ব পায়। মুঘলদের সঙ্গে ওলন্দাজদের খুব একটা সুসম্পর্ক ছিল না। মালবাহী জাহাজগুলোকে নদীপথে আটক করা হতো।
আনুমানিক ১৬১৫-১৬৩৫ সালের মধ্যে ডাচ বা ওলন্দাজরা চুঁচুড়া কেন্দ্রটিতে বাণিজ্যিক কারণে বসতি গড়ে তুলেছিল।
তারা বেশ কিছু কমন স্টোর হাউস তৈরি করেছিলেন। এরপর নির্মাণ হয় নানা রকমের কুঠিবাড়ি। লাল ইঁট দিয়ে শক্তপোক্তভাবে বাড়িগুলো তৈরি হয়েছিল। দেয়ালগুলো খুব মোটা হতো। ঘরের ছাদ থাকত উঁচু। যাতে বাতাস চলাচল ভালো হয়। বাড়িগুলোতে বড় বড় জানালা থাকতো। সামনে খোলা জায়গা জুড়ে হতো বাগান।
আজকের চুঁচুড়ার কমিশনার হাউসটিতে ছিল গভর্নরের বাস যা গভারমেন্ট হাউস নামে পরিচিত। Vereenigde Oostindische Compagnie অর্থাৎ ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে বাগান সহ বাড়িগুলোকে বলতেন ‘ব্যাঙ্গেলায়ার্স’। বাংলা শব্দটি থেকে নাকি ব্যাঙ্গেলায়ার্স কথাটা এসেছিল। যা অবসর যাপনের জায়গা ছিল। দেখতে অনেকটা বাংলোর মতো। চুঁচুড়ায় সেকালে অনুরূপ স্থাপত্যের বাড়ি আরো অনেক ছিল।
মুঘল রাজত্বে এসেছিলেন বিদেশি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়া। তিনি দেখেছিলেন এই সমস্ত অঞ্চল। গঙ্গার ধারে ব্যাঙ্গেলায়ার্সে সাহেবদের জীবন ছিল বিলাসে ভরপুর। প্রকৃতি মাঝে এই জায়গা তাঁদের কাছে ছিল প্রশান্তি ও বিনোদনের অংশ।










