
অমল মাজি
২০০৬-এ ৩০, ২০১১-এ ১৮৪, ২০১৬ সালে ২১১ এবং ২০২১ সালে ২১৫ টি আসন— সংখ্যার এই সারণি বেয়ে তৃণমূল কংগ্রেস এবারের বিধানসভা ভোটে ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছনো নিয়ে নিশ্চিত। বলা ভালো, আত্মবিশ্বাসী বটে। বিধানসভা নির্বাচনের প্রায় অর্ধেক আসনে ভোট আর দিন কয়েক পরেই। তারও ৬ দিন পর বাকি অর্ধেক আসনে ভোট। তাই দিন যত এগিয়ে আসছে ততই চূড়ান্ত থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ খবরের ভিত্তিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কষা হিসাব অনুযায়ী, নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতার চাইতে আসন কম পড়তে পারে। গোপন সূত্রে প্রকাশ, এখনও পর্যন্ত কম পড়া আসনের সংখ্যা তিরিশটা তো বটেই।
প্রথম পর্বের ভোটের ১৫২টি আসন। প্রথম পর্বের ভোটের ১৫২ টি আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের ফল দ্বিতীয় পর্বের ১৪২টি আসনের চেয়ে বেশি খারাপ হওয়ার কথা। প্রথম পর্বের ‘খারাপ হওয়ার’ ধাক্কাটা দ্বিতীয় দফার ভোটেও পড়লে, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাপ্ত আসন সংখ্যা আরও কমতে পারে। এমনকি নবান্নের মসনদ ছুঁতে তৃণমূলের ঘাটতির অঙ্ক ৫০ হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।
এসব হিসাব কোনও সেফোলজিস্ট বা ভোট ফলের আগাম বিশ্লেষণ কিংবা কোনও আগাম সমীক্ষার কথা নয়। খোদ কালীঘাট বা নবান্নের অলিন্দে কান পাতলেই এ ধরনের আতঙ্কের ঠান্ডা বাতাসের ছোঁয়া পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি সর্বোচ্চ নেতৃত্বের স্তর থেকেও ছুঁয়ে ছুঁয়ে এই আতঙ্কের হিমশীতল বারিধারা পৌঁছে যাচ্ছে ঘাসফুলের তৃণমূল স্তর পর্যন্ত। এতে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটবাহিনীর মনোবলেও ক্রমশ চিড় ধরার লক্ষণও ফুটে উঠছে।
আতঙ্কের বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতটা আসলে কী? ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারের প্রতি প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা, দুর্নীতির মতো ইস্যুগুলি তো রয়েইছে, এরই সঙ্গে জুড়ছে গ্রামগঞ্জের ভোট ধীরে হলেও তৃণমূল কংগ্রেসকে বেশ কিছুটা হতাশ করলেও করতে পারে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটাররা এখন কোন অভিমুখে। বিশেষ করে, আইএসএফ-এর এবার বামেদের সঙ্গে জোটে যোগ দেওয়ায় মুসলমান ভোটের একটা বড় অংশ তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে বেরিয়ে এসে জোটের পক্ষে যেতে পারে। এই ধরনের ইঙ্গিত মিলছে দেখা যাচ্ছে, বসিরহাট উত্তর প্রভৃতি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলিতে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে গতবারও আইএসএফ প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকি জয়ী হয়েছিলেন। এবার তারা জোরালো প্রার্থী দিয়েছেন ক্যানিং পূর্ব, মগরাহাট প্রভৃতি কেন্দ্রে। কার্যত গোটা দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন অংশ জুড়ে আইএসএফ-এর প্রভাব নজরে পড়ছে। মগরাহাট, ফলতার মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলিতেও একই অবস্থা হতে পারে।
এছাড়া মালদহ ও মুর্শিদাবাদে এবার চতুর্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কংগ্রেস আলাদা করে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। অনেক আসনেই ভোট কাটাকাটির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর ওপর দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব তো আছেই তৃণমূলে। টিকিট না পাওয়া বিধায়করা বেসুরো গাইছেন। এক বিধায়ক দলত্যাগ করে তিনটি আসনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছেন। হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টিও মালদহ, মুর্শিদাবাদে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটে ভাগ বসালে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সমাজমাধ্যমে যদিও হুমায়ুন কবীরের বিজেপির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা ফাঁস হোক, কিছু লোক যে সে সব বিশ্বাস করেন না তা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। সংখ্যালঘু ভোটের এই চাপ-বাটোয়ারা তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটবাক্সে যে প্রভাব ফেলবে, তা বলাই বাহুল্য।
মুসলমান নেতাদের একাংশ প্রকাশ্যেই বলছেন, তৃণমূল কংগ্রেস মুসলমানদের প্রতি বিশ্বাসভঙ্গ করেছে। ওয়াকফ আইনকে সমর্থন করে তারা মুসলমানদের ধর্মে আঘাত এনেছে। কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিলের ব্যাপারেও তারা বিজেপির বিরুদ্ধে কোনও কথা বলেনি। সম্প্রতি গাজায় ইজরায়েলের নৃশংস হত্যাকাণ্ড চলার সময়ও তৃণমূল কংগ্রেস ইজরায়েল ও আমেরিকার কাজের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র নিন্দা করেনি। শুধু ভোটের আগে টাকা দিলেই কি সংখ্যালঘু মন পাওয়া যাবে? এই সব প্রশ্নগুলিকে সামনে রেখে মুসলমান পুরুষ ভোট তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে যোজন দূরে সরে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এতে বিজেপির কি খুব কিছু সুবিধা হচ্ছে, সেটা এখনই স্পষ্ট নয়। কিন্তু ভোট করানোর কৌশলীরা এবার বলে দিচ্ছেন গতবারের চেয়ে বিজেপি বেশি আসন পাবে। কিন্তু তারাও ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে পারবে কি না, সেটাও বলা সহজ নয়। উত্তরবঙ্গ বা দক্ষিণবঙ্গের সীমান্ত এলাকায় বিজেপির ভোট কমার সম্ভাবনা নেই। আবার বীরভূম থেকে, দিঘা হয়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, খড়দহ, হলদিয়াতে যে তারা ভালো ফল করতে পারবে, সে বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি নেতারা। হয়তো তাঁরা তৃণমূলের চেয়ে বেশি ভোট পাওয়ার ইঙ্গিত পাচ্ছেন। ফলে চতুর্থবার সরকার গড়ার প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে বিজেপি।









