Home / প্রবন্ধ / রোববারের লেখা / সংকীর্ণ স্বার্থে ধর্মের নামে ইতিহাসকে ধ্বংস, মানবজাতির লজ্জা

সংকীর্ণ স্বার্থে ধর্মের নামে ইতিহাসকে ধ্বংস, মানবজাতির লজ্জা

(প্রথম চিত্র) সারনাথের বুদ্ধ। (দ্বিতীয় চিত্র) গবাক্ষের ভেতর বুদ্ধমূর্তি। (তৃতীয় চিত্র) হিন্দু মন্দিরে বুদ্ধমূর্তি

মুকুট তপাদার

হিংসা উন্মুক্ত পৃথিবী আজ। বুদ্ধের অহিংসা পরম ধর্ম। তিনি শান্তির ধর্মকে বিশ্বে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। কিন্ত মহাসাম্যর চিত্র আজ বিপর্যস্ত।

ভারতে সারনাথের জাদুঘরে বেলেপাথরের একটি বুদ্ধমূর্তি আছে। সেখানে দেখা যায় বুদ্ধ শিক্ষাদান ও ধর্ম উপদেশ প্রচার করছেন। যা ধামেক স্তূপের কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছিল। গৌতম বুদ্ধ অবতার, তাঁর দর্শন মানুষকে উচ্চ আদর্শতে উন্নিত করে। বুদ্ধ জীবিতকালেই পূজিত হতেন। দীর্ঘ ৭ বছর পরে বুদ্ধ যখন শাক্যবংশে ফিরেছিলেন তাঁর পুত্র ও স্ত্রী যশোধারা বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করেন। যখন মানবতা বিপন্ন, ওই সময়ে বুদ্ধ জগতের সকল মানুষের কাছে ধর্মকে প্রতিভাত করেন। গুপ্ত যুগকে শিল্পের স্বর্ণযুগ বলা হয়। তবে কুষাণ যুগে বুদ্ধদেবকে আমরা ভাস্কর্য শিল্পে দেখি। মথুরা ও গান্ধার শিল্পে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে পূর্ণ বোধিসত্ব মূর্তি পাওয়া যায়। একসময় বৌদ্ধ স্তূপ ছিল পুজোর প্রতীক। বুদ্ধদেবের শরীরের অবশেষ সেখানে পূজিত হয়। আর বিহারের মধ্যে বুদ্ধ ভিক্ষুরা বাস করতেন। পাল যুগে বুদ্ধ মূর্তির সঙ্গে বজ্রযান শাখার বিভিন্ন দেব দেবী পুজো হতো।

কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডে বুদ্ধ ও বিষ্ণু মূর্তি নিয়ে সম্প্রতি শুরু হয়েছে এক ভয়ানক সংঘর্ষ। দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় চলছে যুদ্ধ। ইতিমধ্যে দুই দেশকে যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবু বারেবারে সংঘর্ষ দানা বাঁধছে। আনুমানিক ষষ্ঠ শতাব্দীর গান্ধার শিল্পশৈলীর এক অনন্য প্রাচীন নিদর্শন বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করা হয়েছিল তালিবানি কায়দায়। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে কড়া আঘাত দেওয়া হল।

আংকর ওয়াটের প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি

কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকায় ৩২৮ ফুটের একটি বিষ্ণু মূর্তিকে ভেঙে ফেলা হয়েছে। মূর্তি কি শুধুই ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা প্রতীক? দেবতার মূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের নানা বিশ্বাস। কম্বোডিয়া- থাইল্যান্ডে মনে করা হয় সম্রাট অশোকের সময়কাল থেকে বৌদ্ধধর্ম এসেছে। যা কম্বোডিয়ার আজ রাষ্ট্রীয় ধর্ম। বেলেপাথরের তৈরি কম্বোডিয়ান এক অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্ত্বের মূর্তি পাওয়া যায় যা সপ্তম শতাব্দির। অবলোকিতেশ্বরের মাথায় ধ্যানরত বুদ্ধ আছেন। ভারতে সাধারণত অবলোকিতেশ্বরকে পদ্ম হস্তে দন্ডায়মান দেখা যায়। বৌদ্ধধর্মে করুণার প্রতীক, যে সত্তা পদ্মপানী(বৌদ্ধ বণিকদের পূজিত দেবতা)। অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে কম্বোডিয়াতে হিন্দু রাজা জয়বর্মন রাজত্ব কায়েম করেন। বহু হিন্দু দেব দেবীর মূর্তি স্থাপন হয়। কিন্ত সব অঞ্চল জুড়ে তখনও বৌদ্ধ প্রভাব ছিল। কারণ পাল রাজবংশের মতো তিনিও বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকায় দুই দেশের মধ্যে চলছে এয়ার স্ট্রাইক। ইতিমধ্যে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সীমান্ত পাহাড়ি এলাকা গুলোতে এখন থমথমে পরিবেশ। মনে করা হয় যে, থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা সুরিন জেলায় বেশ কয়েকটি হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন শিব মন্দির রয়েছে। পরে সেগুলো বৌদ্ধ ধর্মের মন্দির হয়ে ওঠে। কম্বোডিয়া ওই এলাকাটি নিজেদের দাবি করে। সেই নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। এরপর আবার থাই সেনা সীমান্তবর্তী এলাকাতে আট হাত এক বিষ্ণু মূর্তি ধ্বংস করে দেয়। ভাগবত পুরাণে আট হাত বিষ্ণু মূর্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারত এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এই ঘটনায় বিশ্বজুড়েই নিন্দায় সরব হয়েছে মানুষ। কম্বোডিয়ার জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে বিশালাকায় বিষ্ণুর শয়ন মূর্তি। দ্বাদশ শতাব্দীতে খেমার রাজবংশের বিষ্ণু মন্দির, ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট আংকর ওয়াটের প্রাচীন মূর্তির আদলে নির্মিত হয়েছিল সীমান্তবর্তী এলাকার আট হাত বিষ্ণুমূর্তিটি। ওই একই জায়গাতে মূর্তি ধংস করে বুদ্ধ মূর্তি বসানো হয়। এই ঘটনায় আবার নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরব হচ্ছে গোটা বিশ্ব।

পুরাণে গৌতম বুদ্ধকে বিষ্ণুর নবম অবতার মনে করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে বুদ্ধকে নিয়ে হিন্দুধর্মে বহু ধ্যান ধারনা আছে। গরুড় পুরাণে আবার বুদ্ধকে বিষ্ণুর একাদশ অবতার মনে করা হয়। তবে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের সংঘাত ছিল। নীহাররঞ্জন রায় মনে করেন, ‘বর্মণ রাজ রাজবর্মার সময়ে তাঁর সেনারা সোমপুর বৌদ্ধ মহাবিহার আক্রমণ করে। বৌদ্ধদের মধ্যেও হিন্দু ধর্মকে নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। বজ্রযান দেব দেবীর মূর্তিতে হিন্দু ধর্মের বহু দেবতাকে অপমান করা হয়েছে।’ পরিশেষে বলা যায়, ভগিনী নিবেদিতা ‘স্বামীজিকে যেরূপ দেখিয়াছি’ গ্রন্থে লিখেছেন, স্বামীজি শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে ভগবান বুদ্ধকে দেখেছিলেন। তাই বুদ্ধের আদর্শে, ধর্মে, কর্তব্যপালনে অশান্ত পরিস্থিতি থেকে বিশ্ব জুড়ে আজ শান্তি প্রয়োজন। এমন ঘটনা থেকে বিরত হতে হবে যা মানুষের ভাবাবেগে আঘাত করে।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *