Home / প্রবন্ধ / মমতার মতো বিগত সরকারকে দোষারোপ করে সময় নষ্ট নয়, শুরুতেই প্রকৃত উন্নয়নের পথে হাঁটা দরকার শুভেন্দুর

মমতার মতো বিগত সরকারকে দোষারোপ করে সময় নষ্ট নয়, শুরুতেই প্রকৃত উন্নয়নের পথে হাঁটা দরকার শুভেন্দুর

অমল মাজি

টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে প্রথম বার বাংলার তৈরি হল বিজেপি সরকার। শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সঙ্গেই বাংলার মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা, নতুন হিসাব-নিকাশ। ২০১১ সালে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। শিল্প নেই, কর্মসংস্থানের অভাব, দলতন্ত্র, রাজনৈতিক সন্ত্রাস— সব কিছুর পাশাপাশি তিনি বারবার সামনে এনেছিলেন রাজ্যের ঋণের প্রসঙ্গ। প্রায় প্রতিটি সভা-মঞ্চ থেকে বলা হত, “বামেরা লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ চাপিয়ে গিয়েছে।” সেই অভিযোগ এতটাই ঘন ঘন শোনা গিয়েছিল যে, এক সময় তা তৃণমূলের রাজনৈতিক এজেন্ডার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ক্ষমতায় আসার পরও সেই একই সুর বজায় রেখেছিলেন মমতা। প্রশাসনিক ব্যর্থতা হোক বা উন্নয়নের গতি শ্লথ হওয়া— প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাম আমলের আর্থিক বোঝাকে দায়ী করতেন প্রকাশ্যে। মনে পড়ে, হাসপাতালে শিশুমৃত্যুর ঘটনাতেও বলা হয়েছিল ওগুলো বাম আমলের কেস! পাশাপাশি চলত অতীতের নানা ঘটনার তদন্ত, পুরনো সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, বিরোধী বামফ্রন্টকে কোণঠাসা করার কৌশল। এর ফাঁকেই তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর রাজনীতির নতুন সংস্কৃতি— মেলা, খেলা, ক্লাব অনুদান, সামাজিক প্রকল্পের রাজনীতি।

কিন্তু ২০২৬ সালের রায়ে বাংলার মানুষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— শুধু অতীতকে দোষারোপ করে চিরকাল ক্ষমতায় থাকা যায় না। মানুষ শেষ পর্যন্ত কাজের হিসাব চায়। আর সেই কারণেই আজ শুভেন্দু অধিকারীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল, তিনি কি মমতার পথেই হাঁটবেন? নাকি শুরু থেকেই উন্নয়ন, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দেবেন?

কারণ, বিজেপিও দীর্ঘ দিন ধরে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি, কয়লা ও গরু পাচার, পুরসভা নিয়োগে অনিয়ম, কাটমানি, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি— এই সব ইস্যুতে গত কয়েক বছর ধরে সরব ছিল পদ্মশিবির। ভোটের ফলাফলও বলছে, দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ মানুষের একাংশের উপর প্রভাব ফেলেছে। ফলে নতুন সরকার তদন্ত চালাবে, সেটাই স্বাভাবিক। আইনের কাজ আইন করবে, দুর্নীতির অভিযোগের বিচারও হওয়া দরকার।

কিন্তু বাংলার মানুষ বিজেপিকে শুধু তদন্ত করার জন্য ভোট দেয়নি। মানুষ চেয়েছে পরিবর্তন, স্থিতিশীলতা এবং বাস্তব উন্নয়ন। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পহীনতা, কর্মসংস্থানের অভাব, শিক্ষাক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষে ক্লান্ত বাংলার ভোটাররা এ বার নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে আশার চোখে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে প্রথম কয়েক বছর ধরে মূলত অতীতের হিসাব কষতেই বেশি সময় ব্যয় করেছিলেন। বাম আমলের ভুল তুলে ধরে রাজনৈতিক সুবিধা মিলেছিল ঠিকই, কিন্তু শিল্পায়ন বা বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি— এমন মত রয়েছে বহু অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরও। ফলে শুভেন্দুর কাছে এখন বড় শিক্ষা হতে পারে, বাংলার মানুষ আর শুধুই রাজনৈতিক নাটক দেখতে চায় না। তারা ফল দেখতে চায়।

বিশেষ করে কর্মসংস্থানের প্রশ্ন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যের বিপুল সংখ্যক তরুণ দীর্ঘদিন ধরে চাকরির অপেক্ষায়। নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে বহু মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। বিজেপি যদি ক্ষমতায় এসেই স্বচ্ছ ও দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করতে পারে, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা। কারণ, চাকরি আজ বাংলার সবচেয়ে বড় ইস্যুগুলোর একটি।

একই ভাবে শিল্পের প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এক সময় দেশের শিল্প মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল বাংলার। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেই অবস্থান দুর্বল হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদন শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, বন্দর-কেন্দ্রিক ব্যবসা— সব ক্ষেত্রেই নতুন বিনিয়োগ আনা এখন জরুরি। বিজেপি নির্বাচনের আগে একাধিকবার দাবি করেছিল, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে বাংলায় বড় বিনিয়োগ আনা হবে। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়।

তবে শুধু বড় শিল্প নয়, গ্রামীণ অর্থনীতির দিকেও নজর দিতে হবে নতুন সরকারকে। কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং গ্রামীণ যুবকদের জন্য বাস্তবমুখী কর্মসূচি না আনতে পারলে রাজনৈতিক অসন্তোষ দ্রুত বাড়তে পারে। কারণ, বাংলার ভোটের বড় অংশ এখনও গ্রাম নির্ভর। তৃণমূল দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামীণ সামাজিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই শক্তিশালী ছিল।

শুভেন্দুর সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হল প্রশাসনিক সংস্কার। দীর্ঘদিন ধরে বাংলার প্রশাসনের বিরুদ্ধে দলদাসত্ব, দুর্নীতি এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। বিজেপি যদি সত্যিই পরিবর্তনের বার্তা দিতে চায়, তাহলে প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার দিকেই প্রথমে জোর দিতে হবে। পুলিশ, পঞ্চায়েত, পুরসভা— সব ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষতার বার্তা দিতে পারলে সাধারণ মানুষের আস্থা দ্রুত বাড়বে। কিন্তু নতুন সরকার যদি শুধুই আগের শাসক এবং বর্তমানে বিরোধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত আর সস্তা রাজনীতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে খুব দ্রুত জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। কারণ, বাংলার মানুষ সেই রাজনীতি বহুদিন ধরেই দেখে এসেছে।

ফলে শুভেন্দুর জন্য এখন সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে— দ্রুত কাজ দেখানো। রাস্তা, শিল্প, হাসপাতাল, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ— এই সব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে পারলে বিজেপির রাজনৈতিক ভিত্তি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হবে। নাহলে “দুর্নীতি ধরো” রাজনীতি কিছুদিন আলোচনায় থাকলেও, মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সামনে তা গুরুত্ব হারাবে।

আরও একটি বড় প্রশ্ন হল সামাজিক প্রকল্পগুলির ভবিষ্যৎ। লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কন্যাশ্রী, স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড— এই প্রকল্পগুলির সঙ্গে বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বিজেপি সরকার যদি এগুলিকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করে তুলতে পারে, তাহলে রাজনৈতিক সুবিধা পাবে। কিন্তু শুধুমাত্র আগের সরকার করেছে বলে প্রকল্প বন্ধ করার পথে হাঁটলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, বাংলার মানুষ পরিবর্তন আনে প্রত্যাশা থেকে। ২০১১ সালে তারা পরিবর্তন চেয়েছিল বাম আমলের ক্লান্তি কাটাতে। ২০২৬ সালে তারা পরিবর্তন চেয়েছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভ থেকে। কিন্তু দু’ক্ষেত্রেই মূল চাহিদা একটাই— উন্নয়ন এবং স্বচ্ছ প্রশাসন।

সেই কারণেই শুভেন্দু অধিকারীর সামনে আজ সবচেয়ে বড় সুযোগ এবং সবচেয়ে বড় পরীক্ষা— তিনি কি বাংলার রাজনীতিকে শুধুই অভিযোগ, দুর্নীতির তদন্ত এবং অতীতচর্চার মধ্যে আটকে রাখবেন? না কি শুরু থেকেই প্রশাসনিক দক্ষতা, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং বাস্তব উন্নয়নের পথে হাঁটবেন?

মোদ্দাকথা, মানুষ এ বার বিজেপিকে ক্ষমতা দিয়েছে নতুন কিছু দেখার প্রত্যাশায়। এখন আর অজুহাত নয়, ফলাফল দেখতে চাইবে বাংলা।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *