আসানসোল ও কুলটি শিল্পাঞ্চলজুড়ে এখন একটাই আতঙ্ক, উচ্ছেদ। মাথার উপর ঝুলছে বুলডোজারের খাঁড়া, আর বুকভরা অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। কেউ হারাতে চলেছেন বহু বছরের বসতভিটে, কেউ আবার রুজিরুটির শেষ সম্বল। ভারতীয় রেল ও ইসকো কর্তৃপক্ষের কড়া পদক্ষেপ ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গোটা শিল্পাঞ্চল।
কুলটি বিধানসভার বালতোড়িয়া এলাকায় রেলের জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী শতাধিক পরিবারকে উচ্ছেদের নোটিস ধরানো হয়েছে। রেলের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমি খালি না করলে বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে বাড়িঘর। আর সেই নোটিস ঘিরেই ভয়, কান্না আর উদ্বেগে দিন কাটছে বহু পরিবারের।
এদিকে, বার্নপুরেও হকারদের উপর নেমে এসেছে উচ্ছেদের খাঁড়া। ইসকো কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন এলাকায় থাকা হকারদের মাত্র তিন দিনের মধ্যে দোকান সরিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছে। না হলে চলবে বুলডোজার, এমনই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
‘পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ অমানবিক’, সরব বিরোধীরা
পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের বিরুদ্ধে এবার সরব হয়েছে কংগ্রেস ও সিপিএম। শুক্রবার জেলাশাসকের দপ্তরে স্মারকলিপি জমা দিয়ে ক্ষোভ উগরে দেন সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক নেতারা।
কংগ্রেস কাউন্সিলার এস এম মোস্তফা বলেন,
“জমি রেলের হতে পারে, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে যারা এখানে বসবাস করছে, বর্ষার মুখে বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া তাদের উচ্ছেদ করা অত্যন্ত অমানবিক। রেল কর্তৃপক্ষের কাছে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়ার আবেদন জানাচ্ছি।”
বিজেপির তথাকথিত ‘বুলডোজার নীতি’র সমালোচনা করে কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ পৈতণ্ডি বলেন,
“মানুষ বিজেপিকে ভরসা করে ভোট দিয়েছে। আর আজ সেই বিজেপিই অসহায় মানুষের মাথার ছাদ গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে। পুনর্বাসন ছাড়া মানুষকে ঘরছাড়া করা অপরাধ। রামরাজত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আজ গরিবের ঘর ভাঙা হচ্ছে।”
আরেক কংগ্রেস কাউন্সিলার শাহ আলম কড়া ভাষায় বলেন,
“গরিব মানুষকে উচ্ছেদ করতে এরা উঠেপড়ে লেগেছে। সাহস থাকলে রেলের জমিতে গড়ে ওঠা বড় ব্যবসায়ীদের অট্টালিকা ভেঙে দেখাক!”
জেলাশাসকের দপ্তরে হাজির হওয়া বহু মানুষের চোখেমুখে ছিল ভয় আর অনিশ্চয়তার ছাপ।
বালতোড়িয়ার বাসিন্দা একজন মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
“বিয়ে হয়ে এখানে এসেছি। সাতপুরুষ ধরে সবাই এখানে থেকেছে। এখন স্বামী-শ্বশুর কেউ নেই। আমি কোথায় যাব?”
আর এক মহিলা বাসিন্দা প্রশ্ন তোলেন,
“এতদিন সরকার বিদ্যুৎ-জল সব দিয়েছে। তখন তো কেউ বলেনি জমি ছাড়তে হবে! ভোটের আগে কত প্রতিশ্রুতি, আর এখন আমাদেরই ঘরছাড়া করতে চাইছে!”
বার্নপুরে হকারদের বিক্ষোভ, সিপিএমের হুঁশিয়ারি
বার্নপুরে ইসকোর নোটিসের প্রতিবাদে শুক্রবার সিপিএম নেত্রী শিল্পী চক্রবর্তীর নেতৃত্বে টাউন অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখান হকাররা।
শিল্পী চক্রবর্তী বলেন,
“হকাররা বছরের পর বছর ব্যবসা করে সংসার চালাচ্ছেন। পুনর্বাসন না দিয়ে হঠাৎ দোকান ভেঙে দিলে হাজার হাজার পরিবার পথে বসবে। বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ছাড়া বুলডোজার চলতে দেব না।”
এখন প্রশ্ন একটাই, উন্নয়নের নামে কি গরিব মানুষের মাথার ছাদ কেড়ে নেওয়া হবে? নাকি পুনর্বাসনের পথেই সমাধান খুঁজবে প্রশাসন? শিল্পাঞ্চলে সেই উত্তর খুঁজছে আতঙ্কে দিন গোনা হাজার হাজার পরিবার।










