অমল মাজি, চিত্তরঞ্জন-মিহিজাম
বয়স মাত্র ১৭, কিন্তু অপরাধের খাতা যেন সিনেমাকেও হার মানায়! পিস্তল, কার্তুজ, লুটের বাইক উদ্ধার, আতঙ্কে কাঁপছিল দুই রাজ্যের সীমান্ত এলাকা চিত্তরঞ্জন-মিহিজাম।
বয়স এখনও ভোট দেওয়ার হয়নি, কিন্তু তার নাম শুনলেই থরহরি কম্প শুরু হতো এলাকায়।
চিত্তরঞ্জন ও মিহিজামে একের পর এক লুট, ছিনতাই, গুলিচালনা, সবকিছুর নেপথ্যে ছিল মাত্র ১৭ বছরের এক কুখ্যাত নাবালক দুষ্কৃতী। অবশেষে বহুদিনের তল্লাশির পর পুলিশের জালে ধরা পড়ল সেই ‘মাস্টারমাইন্ড’। আর গ্রেফতারের পর যা উদ্ধার হয়েছে, তা শুনে চমকে উঠছেন তদন্তকারীরাও।
পুলিশ সূত্রে খবর, ১১ মে গভীর রাতে চিত্তরঞ্জনের ৭০ নম্বর রাস্তায় এক মহিলা বাইক আরোহী ভয়ঙ্কর ছিনতাইয়ের শিকার হন। কবিতা রেনু নামে ওই মহিলার মোবাইল, নগদ টাকা, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র-সহ হাতব্যাগ ছিনিয়ে মুহূর্তে চম্পট দেয় দুষ্কৃতীরা।
তারও আগে ৪ মে মিহিজামের ঢেঁকিপাড়া কবরস্থান এলাকায়, আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে এক রেলকর্মীকে ঘিরে ধরে সর্বস্ব লুট করে তিন যুবক। পরপর এই দুই ঘটনায় রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সীমান্ত এলাকায়।
তদন্তে নেমে পুলিশ প্রথমে বুঝতেই পারেনি, এত বড় অপরাধচক্রের ‘মাথা’ একজন নাবালক হতে পারে! কিন্তু গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্য ধীরে ধীরে খুলে দেয় ভয়ঙ্কর রহস্যের পর্দা।
জামতাড়া পুলিশ সুপার শম্ভু কুমার সিংয়ের নির্দেশে, মিহিজাম থানার ওসি প্রদীপ রানার নেতৃত্বে তৈরি হয় বিশেষ দল। এরপর ঝাড়খণ্ডের সাহারডাল এলাকায় গোপন অভিযান চালিয়ে অবশেষে পাকড়াও করা হয় ১৭ বছরের সেই অভিযুক্তকে।
গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে,
একটি পিস্তল,
তাজা কার্তুজ,
লুটকাণ্ডে ব্যবহৃত কালো অ্যাপাচে বাইক,
একাধিক লুটের সামগ্রী,
এমনকি চিত্তরঞ্জনের ঘটনায় ছিনতাই হওয়া আধপোড়া পার্সও!
পুলিশের দাবি, এই নাবালক শুধু লুটের ছক কষত না, গোটা চক্রকেই পরিচালনা করত ‘অপারেশন হেড’-এর মতো!
সাংবাদিক বৈঠকে পুলিশ সুপার জানান, চিত্তরঞ্জনের ঘটনায় দুই ও মিহিজামের ঘটনায় তিনজন জড়িত থাকলেও পুরো চক্রের সুতো নড়াচড়া করত এই নাবালকই।
তদন্তে সামনে এসেছে আরও এক রক্ত হিম করা তথ্য। পুলিশ জানতে পেরেছে, ২০২৫ সালের ৬ মার্চ বিনোদ যাদবের উপর এলোপাথাড়ি গুলিচালনার ঘটনাতেও যুক্ত ছিল এই নাবালক। সেই হামলায় প্রাণে বাঁচলেও চিরতরে পঙ্গু হয়ে যান বিনোদ যাদব।
প্রশ্ন উঠছে, ১৭ বছরের এক কিশোরের হাতে কীভাবে এলো আগ্নেয়াস্ত্র? কীভাবে গড়ে উঠল এমন ভয়ঙ্কর অপরাধ সাম্রাজ্য? তদন্তকারীদের অনুমান, পশ্চিমবঙ্গ-ঝাড়খণ্ড সীমান্তে সক্রিয় বড়সড় অপরাধচক্রের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ ছিল তার। সেই নেটওয়ার্কই তাকে দীর্ঘদিন পুলিশের চোখ এড়িয়ে থাকতে সাহায্য করেছে।
এদিকে এলাকায় শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, “বয়স কম হলেই কি অপরাধ ছোট হয়ে যায়? এত ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িত হলে কড়া শাস্তি হওয়া উচিত।” ভুক্তভোগী পরিবারগুলিরও দাবি, কোনওভাবেই যেন আইনের ফাঁক গলে পার না পায় এই অভিযুক্ত।
সীমান্তজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন, ১৭ বছর বয়সেই যদি এমন ‘ক্রাইম কিং’, তাহলে এর পিছনে রয়েছে আর কারা? পুলিশের নজর এখন সেই বড় চক্রের দিকেই।









