সালানপুর: গ্যাস ঘাটতির অজুহাত দেখিয়ে আচমকাই উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল কারখানা কর্তৃপক্ষ। আর সেই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল সালানপুরের দেন্দুয়া শিল্পাঞ্চল। বেসরকারি ‘বালাজি সিরামিক্স’ কারখানার শতাধিক শ্রমিক ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিক্ষোভে সামিল হন। শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কম মজুরি, পিএফ-ইএসআই বঞ্চনা ও শ্রমিক শোষণের পর এবার বিনা নোটিশে কারখানা বন্ধ করে কার্যত রাস্তায় বসিয়ে দেওয়া হল তাঁদের।
শ্রমিকদের দাবি, গত ৩০ মে হঠাৎ করেই কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখা হবে। তবে এই ঘোষণার আগে শ্রমিকদের কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা বা বিকল্প ব্যবস্থা জানানো হয়নি। ফলে এক লহমায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায় কয়েকশো শ্রমিক পরিবারের ভবিষ্যৎ।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের অভিযোগ, বহুদিন ধরেই ন্যায্য মজুরি দেওয়া হচ্ছিল না। বর্তমান বাজারদরে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে আচমকা কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তাঁরা। শ্রমিকদের স্পষ্ট দাবি, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও নিয়মিত মজুরি দিতে হবে এবং শ্রমিক স্বার্থ সুরক্ষিত করতে হবে।
এই দাবিকে সামনে রেখে শ্রমিক নেতা অমর মাহাতো-র নেতৃত্বে গত ৩০ মে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক হয়। অভিযোগ, সেই সময় কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছিল উচ্চপদস্থ কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে ২ জুন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। কিন্তু মঙ্গলবার শ্রমিকরা কারখানায় পৌঁছতেই ক্ষোভ আরও চরমে ওঠে। শ্রমিকদের দাবি, কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দেয়, তাঁদের কোনো দাবি মানা সম্ভব নয়।
এরপরই কারখানার সামনে শুরু হয় তীব্র বিক্ষোভ। শ্রমিক নেতা অমর মাহাতোর অভিযোগ,
এখানে বছরের পর বছর শ্রমিকদের শোষণ করা হয়েছে। সরকারি নিয়ম মেনে ন্যূনতম বেতন দেওয়া হয়নি। নেই শ্রম সুরক্ষা, নেই PF ও ESI-এর মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা। এখন আবার বিনা নোটিশে কারখানা বন্ধ করে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
তবে আন্দোলনের মাঝেই শ্রমিকদের মধ্যে মতভেদও সামনে এসেছে। অধিকাংশ শ্রমিক আন্দোলনে সামিল হলেও, অন্য একাংশের বক্তব্য, কারখানা যে শর্তে চালু থাকবে, সেই শর্তেই কাজ করতে রাজি তাঁরা। ফলে শ্রমিক মহলের ভেতরেও বিভাজনের ছবি স্পষ্ট।
এদিকে, কারখানা কর্তৃপক্ষের ভূমিকাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। শ্রমিকদের অভিযোগ, সাংবাদিকদের উপস্থিতি ছাড়া নয়, বরং সাংবাদিকদের বাদ দিয়েই একান্তে আলোচনা করতে চাইছিল কর্তৃপক্ষ। কেন সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা, তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। যদিও এই বিষয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি কারখানা কর্তৃপক্ষ।
আলোচনার রাস্তা কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবার আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটছেন শ্রমিকরা। মঙ্গলবার শ্রমিকদের পক্ষ থেকে গণস্বাক্ষর সম্বলিত একটি ‘মাস পিটিশন’ তৈরি করে লেবার কমিশনের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দেন্দুয়া শিল্পাঞ্চলে এই ঘটনাকে ঘিরে এখন তীব্র উত্তেজনা। একদিকে পেটের দায়, অন্যদিকে অধিকারের লড়াই, এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে এখন প্রশ্ন একটাই, বালাজি সিরামিক্স কি ফের খুলবে? নাকি শতাধিক শ্রমিকের জীবনে নামবে আরও বড় অন্ধকার?









