অন্ডাল: ২০২০ সালের ১৬ জুলাই পশ্চিম বর্ধমানের অন্ডাল ব্লকের হরিশপুর গ্রামে আচমকাই ধসের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় কয়েকশো মানুষের জীবন। নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে গোটা গ্রাম। তারপর কেটে গিয়েছে পাঁচ বছর। এই সময়ে পুনর্বাসনের দাবিতে একাধিকবার রাস্তা অবরোধ, প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়া থেকে শুরু করে ভোট বয়কটের মতো চরম সিদ্ধান্তও নিয়েছেন গ্রামবাসীরা। তবুও আজও মেলেনি স্থায়ী পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা।
বৃহস্পতিবার সেই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা হিসেবে অন্ডালের কাজী নজরুল ইসলাম বিমানবন্দর সংলগ্ন পুনর্বাসন প্রকল্প এলাকায় একটি কমিউনিটি হলে হরিশপুর গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে বৈঠক করেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশাসক বা ডিএম এস পোন্নাবলম, রানিগঞ্জের বিধায়ক পার্থ ঘোষ, আসানসোল দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদ বা আড্ডা, ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড বা ইসিএল ও আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের আধিকারিকেরা ও ব্লক প্রশাসনের প্রতিনিধিরা।
হরিশপুর সহ ধসপ্রবণ একাধিক গ্রামের পুনর্বাসনের জন্য ইসিএল বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় বহুতল আবাসন নির্মাণ করেছে। কিন্তু সেই ফ্ল্যাটই এখন পুনর্বাসনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ফ্ল্যাটগুলি অত্যন্ত ছোট, নির্মাণের গুণমানও নিম্নমানের। খোলা পরিবেশে বসবাসে অভ্যস্ত মানুষদের জন্য ওই আবাসন কোনওভাবেই উপযুক্ত নয়। তাই পুনর্বাসনের প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ পরিবার সেখানে যেতে রাজি নন।
বৈঠকে গ্রামবাসীরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, বিমানবন্দর এলাকার ফ্ল্যাট নয়, তারা চান ইসিএলের পুনর্বাসন প্রকল্পের আদলে জমি সহ বসবাসযোগ্য বাড়ি। তাদের বক্তব্য, শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, জীবন-জীবিকা ও সামাজিক পরিবেশের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রামবাসীদের বক্তব্য শোনার পর মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে আমি ইসিএল কর্তৃপক্ষ, মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় কয়লামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করব। গ্রামের মানুষ খোলামেলা পরিবেশে থাকতে অভ্যস্ত। যে ধরনের ফ্ল্যাট তৈরি হয়েছে, তা তাঁদের উপযুক্ত নয়। কিভাবে তাঁদের জন্য গ্রহণযোগ্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যায়, তা নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হবে।
তিনি আরো বলেন, অন্ডালের কাজী নজরুল ইসলাম বিমানবন্দরকে ঘিরে রাজ্য সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে এটিকে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার ভাবনা রয়েছে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই গোটা এলাকার পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হবে। তবে উন্নয়নের স্বার্থে স্থানীয় মানুষের স্বার্থ যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সেই দিকেও নজর দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
একই সঙ্গে পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগে মন্ত্রী বলেন, আগের সরকার নানা প্রকল্পে দুর্নীতি করেছে। পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও পরিকল্পনার অভাব ছিল। ফলে আজ মানুষ সমস্যায় পড়েছেন।
তবে বৈঠক শেষে গ্রামবাসীদের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট, আশ্বাস মিললেও সংশয় কাটেনি। হরিশপুরের এক বাসিন্দার কথায়, বৈঠক পুরোপুরি ব্যর্থ নয়। মন্ত্রী আমাদের কথা শুনেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু যতক্ষণ না বাস্তবে গ্রহণযোগ্য পুনর্বাসন হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারছি না।
পাঁচ বছরের অপেক্ষার পরেও তাই হরিশপুরের মানুষের সামনে এখনও একই প্রশ্ন, আশ্বাসের পুনর্বাসন, না কি বাস্তবের ঠিকানা? আন্দোলনের পথ পেরিয়ে এ দিনের বৈঠক নতুন করে আশার আলো দেখালেও, স্থায়ী সমাধানের দাবিতে গ্রামবাসীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা যে এখনও শেষ হয়নি, তা এদিনের মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার পরে স্পষ্ট হয়ে গেছে।









