Home / প্রবন্ধ / রোববারের লেখা / উনিশ শতকে কলকাতার অদূরে রামলোচন ঘোষের ঘাট

উনিশ শতকে কলকাতার অদূরে রামলোচন ঘোষের ঘাট

মুকুট তপাদার

পুণ্যগঙ্গার কাছাকাছি উনিশ শতকের স্মৃতি। এখানে মন্দিরের সামনে পুরনো গাছের ডাল গঙ্গার জল ছুঁয়ে ফেলে। চারদিকে ছড়িয়ে আছে কত পুরনো দেবমন্দির। কাছেই কুঠিবাড়ি, পুরনো বাজার, মন্দির ঘেরা ঘাট ও বহু মহাপুরুষের দ্বারা স্মৃতিধন্য জনপদ। ইতিহাস যেখানে এসে গঙ্গার শান্ত তরঙ্গে পা ধুয়ে বসে থাকে – স্মৃতি যেখানে শতাব্দীর ধুলোবালি মেখে আছে, তেমনই এক কালজয়ী জনপদ বরানগর। শ্রীচৈতন্যদেব থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, তাঁদের পদধূলিতে ধন্য। আর এই বরানগরের আলমবাজারেরই বুক চিরে গঙ্গার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক ঘাট, রামলোচন ঘোষের ঘাট। রামলোচন ঘোষ ১৭৩৪ শকাব্দ অর্থাৎ ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে ঘাটটি নির্মাণ করেন। এই ঘাট কেবলই এক পাথুরে চাতাল বা গঙ্গা পাড় নয়, এটি আসলে অতীতের এক জীবন্ত দলিল।

এই ঘাটের নামকরণের নেপথ্যে জড়িয়ে আছেন ব্রিটিশ আমলের এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব রামলোচন ঘোষ। তিনি ছিলেন ভারতের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের অত্যন্ত বিশ্বস্ত দেওয়ান। এই ঘাটের ঠিক পাশেই হেস্টিংসের একটি কুঠিবাড়ি ছিল। যেখান থেকে একসময় হয়তো নিয়ন্ত্রিত হতো এই অঞ্চলের অনেক রাজনৈতিক রূপরেখা।

রামলোচন ঘোষের উত্তরসূরিরা বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে এক গভীর ছাপ রেখে গেছেন। তাঁরই সুযোগ্য পৌত্র ছিলেন কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার বিখ্যাত বাবু খেলাত চন্দ্র ঘোষ। খেলাত ঘোষের বাড়ির দুর্গাপূজা আজও কলকাতার ঐতিহ্যের এক অন্যতম অংশ। কিন্তু সেকালের ‘বাবুয়ানি’ সংস্কৃতির এক চমকপ্রদ নিদর্শন ঘটেছিল এই খেলাত ঘোষের আমলে। শোনা যায়, এক জলসায় এক বিশাল আকৃতির রাজকীয় সন্দেশের ওপর দাঁড়িয়ে বাইজি নাচের আসর হয়েছিল। আভিজাত্যের এক অদ্ভুত কাহিনী আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী।

১৮৯২ সাল। এই রামলোচন ঘোষের ঘাটের কাছেই এক জীর্ণ, পরিত্যক্ত বাড়িতে মাত্র এগারো টাকা মাসিক ভাড়ায় থাকতে শুরু করলেন শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ত্যাগী সন্ন্যাসী সন্তানেরা। বরানগর মঠ থেকে স্থানান্তরিত হয়ে এটিই হয়ে উঠল দ্বিতীয় মঠ। তখন স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্মসভার উদ্দেশ্যে মহাসমুদ্রে পাড়ি দিয়েছেন, আর তাঁর গুরুভাইরা গঙ্গার ধারের এই নিঝুম, নির্জন পরিবেশে কাটাচ্ছেন তীব্র অনটনে দিনগুলি।

গঙ্গার ধারে রামলোচন ঘোষের ঘাটে বহু পুরনো দ্বাদশ শিব মন্দির রয়েছে। যা বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের প্রতীক। মন্দিরগুলি একটি বর্গাকার আকৃতির পাকা উঠানের ওপর, বেশ উঁচু এক মঞ্চে অবস্থিত। বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী আটচালা রীতি মেনে তৈরি। ঘাটে দাড়িয়ে দেখা যায় গঙ্গার উপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে বালি ব্রিজ। প্রকৃতির রুদ্ররূপেরও সাক্ষী এই ঘাট। সালটা ছিল ১৮৬৪, এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে উত্তাল হয়ে উঠেছিল গঙ্গার বুক। গঙ্গার সেই উন্মত্ত ঢেউয়ের তোড়ে নোঙর ছিঁড়ে, একটি বিশাল আকৃতির জাহাজ এসে আছড়ে পড়ে এই লোচন ঘোষের ঘাটে। আজকের বরানগরে রামলোচন ঘোষের ঘাট হয়তো তার পুরোনো চেহারা হারিয়েছে। এই ঘাটটি যেন এক পরম তীর্থ।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *