ছবি: রাজীব বসু
মেদিনীপুরের মাটির ছেলে থেকে বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু—শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক যাত্রাপথ যেন পূর্ণতা পেল ব্রিগেডের ঐতিহাসিক মঞ্চে। জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলার নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তিনি। পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির করকুলি গ্রামের ‘বুবাই’ আজ রাজ্যের প্রশাসনিক শীর্ষে।
১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর জন্ম শুভেন্দুর। বাবা বর্ষীয়ান রাজনীতিক শিশির অধিকারীর রাজনৈতিক পরিবেশেই বড় হয়ে ওঠা। পরিবার ও বন্ধুদের কাছে ছোটবেলা থেকেই তিনি ‘বুবাই’ নামেই পরিচিত। কাঁথি প্রভাত কুমার কলেজে ১৯৮৭ সালে কমার্স নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি। সেই সময় কলেজ চত্বরে বাম ছাত্র সংগঠনের দাপট থাকলেও নিজের লড়াকু মানসিকতা দিয়ে টানা দু’বার কলেজের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন তিনি।
রাজনীতির পাশাপাশি পড়াশোনাতেও সমান মনোযোগী ছিলেন শুভেন্দু। মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিতি ছিল। তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তির কথা এখনও বন্ধুদের মুখে শোনা যায়। পরে ২০১১ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন তিনি।
রাজনৈতিক উত্থানের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয় পুরসভা ও সমবায় রাজনীতির মাধ্যমে। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ। এরপর কাঁথি কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক, কাঁথি কার্ড ব্যাঙ্ক-সহ একাধিক সমবায় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলে নিজের জনভিত্তি আরও শক্ত করেন। ২০০৯ সালে অল্প সময়ের জন্য কাঁথি পুরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্বও সামলান।
তবে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুগবেড়িয়া কেন্দ্রে তৎকালীন মন্ত্রী কিরণময় নন্দের কাছে পরাজিত হতে হয়েছিল। কিন্তু সেই হারই যেন তাঁকে আরও লড়াইয়ের শক্তি দেয়।
২০০৬ সালে দক্ষিণ কাঁথি কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে শুরু হয় শুভেন্দুর জয়ের ধারাবাহিকতা। ২০০৯ ও ২০১৪ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে সাংসদ হন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অধ্যায় হয়ে ওঠে নন্দীগ্রাম আন্দোলন। ২০১৬, ২০২১ ও ২০২৬—টানা তিনবার নন্দীগ্রামের বিধায়ক নির্বাচিত হন তিনি।
২০২৬ সালের নির্বাচনে শুভেন্দু আরও বড় রাজনৈতিক নজির গড়েন। শুধু নন্দীগ্রাম নয়, কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্র থেকেও জয় পান তিনি। বিশেষ করে ২০২১ ও ২০২৬ সালে পরপর দু’বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে রাজ্য রাজনীতিতে নিজের অবস্থানকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
মেদিনীপুরের মেঠোপথ থেকে উঠে আসা সেই ‘বুবাই’ আজ বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর হাত ধরেই প্রায় ছয় দশক পর আবার পূর্ব মেদিনীপুর পেল মুখ্যমন্ত্রী। এর আগে ১৯৬৭ সালে অবিভক্ত মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র অজয় মুখার্জি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই যেন ঘটালেন শুভেন্দু অধিকারী।










