কলাভবন ও অঁদ্রের আঁকা সেলফ পোট্রেট
মুকুট তপাদার
ফরাসি চিত্রশিল্পী অঁদ্রে কার্পেলের তখন খুব অল্প বয়স। ছোট্ট মেয়েটি একদিন প্যারিসে বসে এক ইংরেজি পত্রিকায় তাঁর চোখে পড়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা চিত্র। কালীদাসের ‘মেঘদূত’-এর ওপর ভিত্তি করে সেই চিত্রটি। চিত্রখানি দেখে যেন মুহূর্তেই স্পর্শ করেছিল তরুণ শিল্পীর মনকে। যদিও তা ছিল শুধুই শিল্পের মাধ্যমে, দূর থেকে। সেই তাঁর প্রথম পরিচয় ঘটলো জোড়াসাঁকোর অবন ঠাকুরের সঙ্গে। অঁদ্রে পরবর্তীতে অবন ঠাকুরকে নিজের গুরু বলে মনে করতেন। অঁদ্রে বলতেন – ‘আমার গুরু’।
১৯১৩ সালে কলকাতায় আসলেন অঁদ্রে কার্পেলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে ১৯১৯ সালে শান্তিনিকেতনে কলাভবন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা খোলা আকাশের নীচে প্রকৃতির সান্নিধ্যে দলবদ্ধভাবে ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান। এর উদ্দেশ্য আসলে আরও বৃহৎ। ধর্মীয় বিভাজন সরিয়ে দিয়ে বিশ্বজনীন জ্ঞান আহরণ। প্রতিষ্ঠানটি যখন শুরু হয়েছিল শিল্পী নন্দলাল বসু এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। দেশ-বিদেশ থেকে বিখ্যাত সব চিত্রশিল্পী এই ভবনে আসতে শুরু করলেন। ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হল।
অঁদ্রে কার্পেলে বিশ্বভারতীতে এলেন। মুক্ত পরিবেশে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পরীতির সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের পরিচয় ঘটলো। শান্তিনিকেতন পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ‘কলাবিদ্যা’ নামক প্রবন্ধে শিল্পকলা-শিক্ষা বিষয়ক মূল্যবান লেখাটি লিখেছিলেন। অঁদ্রের সঙ্গে তাঁর পরিবার আসলেন শান্তিনিকেতনে। ক্রমে ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বেড়ে চললো। রবীন্দ্রনাথ সেই সময় কলাভবনে এক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী করেন। শান্তিনিকেতনের কলাভবনে এক সময় এই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আয়োজনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিলেন অঁদ্রে ও নন্দলাল বসু। শিল্পকলা ও সংস্কৃতিকে এক মঞ্চে তুলে ধরাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। যা শিল্পপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। আসলে শিল্পের এই উদ্যোগ বিশ্বসংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
ফরাসি চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে বহুদিন কাটিয়েছিলেন। ভালো লেগে গিয়েছিল তাঁর সহজ-সরল গ্রামীণ পরিবেশ। কালিতে, রেখাচিত্রে, জলরঙে তাঁর বেশ কিছু শিল্পকর্ম শান্তিনিকেতনের সংগ্রহশালায় রয়েছে। ইউরোপীয় দেয়ালচিত্র শিক্ষার্থীদের শেখান। তেল রঙের ব্যবহার শেখান। ভারতীয় শিল্পকলার প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। বুদ্ধের নানা ধরনের ছবি আঁকেন। তাঁর ছবিতে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের শিল্পের একটি মিশ্রণ দেখা যেতো।
সুইডিশ ডাল হগম্যানের সঙ্গে ১৯২৩ সালে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অঁদ্রে এক ইহুদি কন্যাকে দত্তক নেন। সেই কন্যার নাম ফ্লোরা হগম্যান। অদ্ভুতভাবে তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর দত্তক কন্যা নন্দিনীর খুবই মিল ছিল। অঁদ্রে সেকথা স্বীকারও করতেন। তাদের দুজনের মধ্যে অদ্ভুত যেন মিল। কবি এই দুই কন্যাকে খুব ভালবাসতেন। বিয়ের পর অঁদ্রে বিদেশে যান। তারপর শান্তিনিকেতনে আর ফেরা হয়নি।

অঁদ্রে কার্পেলের আঁকা নন্দিনী
ঠাকুরবাড়ির ইতিহাসে প্রথম বিধবা বিবাহ হয় প্রতিমা দেবীর। কবি নিজ পুত্রের সঙ্গে তাঁর বিবাহ দেন। প্রতিমা দেবীর দত্তক কন্যা ছিল কবির অতি স্নেহের। কবি প্রিয় নন্দিনীকে পুপে, পুষু এসকল নামে ডাকতেন। ফরাসি ভাষায় পুপে এর অর্থ পুতুল। অনেকে মনে করেন এই নামটি অঁদ্রে দেন। সেই স্নেহময় সম্পর্কের আবেশেই অঁদ্রে এঁকেছিলেন নন্দিনীর এক প্রতিকৃতি। ছবিটি কবির স্নেহের সম্পর্কের এক স্মারক। শিশুমনের দীপ্তি ও সরলতার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে ছবিতে। শিল্পী অঁদ্রের সৃষ্টি যা তাকে চিরন্তন করে রেখেছে। সকল সৃষ্টির মধ্যে এক ভিন্ন উপলব্ধি।
তথ্যসূত্র : দর্পণ পত্রিকা, নির্মলকুমারী মহলানবিশ, প্রবাসী পত্রিকা, শান্তিনিকেতন পত্রিকা।










