অমল মাজি
দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের বুকে ফের বিস্ফোরক অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে। আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদ (এডিডিএ)-র জমি ও প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এবার সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ তুলল বিজেপি। অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে “উন্নয়ন” ও “প্রকল্প”-এর নাম করে সরকারি জমি দখল করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করা হয়েছে। আর এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একাধিক প্রাক্তন চেয়ারম্যানের নাম।
বিজেপির দাবি, পানাগড় থেকে আসানসোল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় এডিডিএ-র বোর্ড লাগিয়ে জমি দখলের রাজনীতি চলেছে দীর্ঘদিন। কোথাও রাস্তার ধারে, কোথাও ব্যবসায়িক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়, সরকারি জমি চিহ্নিত করে তা ভবিষ্যৎ প্রকল্পের নামে আটকে রাখা হলেও বাস্তবে কোনও উন্নয়ন হয়নি। বরং সেই জমিকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে দুর্নীতির সাম্রাজ্য।
নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন সরাসরি আক্রমণ করে বলেন,
“এডিডিএ-র নামে ভয়ঙ্কর দুর্নীতি হয়েছে। প্রাক্তন চেয়ারম্যান কবি দত্তকে অবিলম্বে গ্রেফতার করা উচিত। বোর্ড লাগিয়ে জমি দখল করা হয়েছে। তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে।”
এখানেই থামেননি তিনি।
চন্দ্রশেখরবাবু প্রকাশ্যে
বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে বলেন,
“দুর্গাপুরের মানুষ জানেন, কবি দত্তের মদতেই এডিডিএ-তে আগুন লাগানো হয়েছিল, তারফলে গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত ফাইল পুড়ে যায়। এছাড়া সিটি সেন্টারে নিজের হোটেলের প্ল্যানিং সংক্রান্ত গণ্ডগোলের জন্য তৎকালীন মেয়র দিলীপ অগস্তি ৮২ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছিলেন। এরপরই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, অভিষেক ব্যানার্জি এবং মমতা ব্যানার্জীকে দিয়ে দিলীপ অগস্তিকে মেয়র পদ থেকে সরানো হয়।”
চন্দ্রশেখরবাবুর আরও অভিযোগ, সরকারি ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজের হোটেলের সামনে রাস্তা সংস্কার, ফোয়ারা বসানো, সৌন্দর্যায়নের কাজ, সবই হয়েছে “বিশেষ সুবিধা” দিতে।
আরও অভিযোগ, সরকারি টাকা ব্যবহার করে ফোয়ারা নির্মাণ, আর জমি উদ্ধারের নামে আদতে হকারদের পেটে লাথি মেরে নিজের হোটেলে লিফট বসিয়েছেন জবরদখল করা সরকারি জমিতেই।
এদিকে বিজেপি কর্মীদের অভিযোগ, সিটি সেন্টার এলাকায় রাস্তার দু’ধার থেকে হকার উচ্ছেদ করা হলেও পুনর্বাসনের কোনও ব্যবস্থা হয়নি। অথচ সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় রাস্তা সংস্কার বা যানজট সমস্যার সমাধানে কোনও উদ্যোগ নেয়নি এডিডিএ। ফলে ক্ষোভ বাড়ছে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও।
এদিকে সিটি সেন্টার এলাকায় “এডিডিএ ল্যান্ড” লেখা একাধিক সাইনবোর্ড খুলে ফেলতে দেখা যায় বিক্ষুব্ধ বিজেপি কর্মী ও সাধারণ মানুষদের। তাঁদের বক্তব্য,
“শুধু বোর্ড লাগিয়ে জমি আটকে রাখার রাজনীতি আর চলবে না। কোথায় কী প্রকল্প হবে, তার স্বচ্ছ হিসাব দিতে হবে।”
এরই মধ্যে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে দুর্গাপুর পুরসভার ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায়। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই নাকি এই ফাইলগুলির আর কোনও খোঁজ নেই। ফলে একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প আটকে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অভিযোগ, স্মার্ট বাজার সংলগ্ন এলাকায় ভোটের আগে জেসিবি দিয়ে পাঁচিল ভেঙে জমি প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু ভোট মিটতেই আচমকা সেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কোন প্রকল্পের জন্য কাজ হচ্ছিল, তার কোনও সরকারি তথ্য বা বোর্ড আজও প্রকাশ্যে আসেনি।
পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলের রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিজেপি ইতিমধ্যেই এডিডিএ-র জমি, প্রকল্প ও আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছে।
এখন শিল্পাঞ্চলের মানুষের মুখে একটাই প্রশ্ন,
উন্নয়নের আড়ালে কি সত্যিই চলেছে পরিকল্পিত জমি দখল ও দুর্নীতির খেলা?










