টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কারুকার্যে বিষ্ণুপুরের মদনমোহন মন্দির
মুকুট তপাদার
মল্ল রাজ্যের প্রজাপালক রাজার ইষ্টদেবতা আকালের সাক্ষী। বাংলা ও বিহারের এক তৃতীয়াংশ জুড়ে মানুষ তখন গুমরে গুমরে কাঁদছে। কোম্পানির কঠোর খাজনা আদায়ে সমাজ এক গভীর সংকটের সম্মুখীন। সর্বত্র শুধু জনগোষ্ঠীর মর্মঘাতী বেদনা। লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বজন সর্বস্ব হারিয়ে দুর্ভিক্ষের কবলে। কঙ্কালসার মানুষদের ঘিরে আছে শকুন আর হাড়গিলেরা। কোথাও আবার গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য। অনাবাদী জমি। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে গৌতম ভদ্রের মতো ঐতিহাসিকরা মনে করেন কোম্পানির দেওয়ানি ব্যবস্থার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের অতিরিক্ত করের বোঝাতে প্রাণ হারানোর ঘটনা দুর্ভিক্ষের একমাত্র কারণ হতে পারে না। দাদনি প্রথার ফলে বহু নিম্নবর্গের ব্যবসায়ী মানুষের দুর্দশা ঘটেছিল। বিষ্ণুপুরে তসর ও সিল্ক হল বিখ্যাত। এখানকার তন্তুবায়রা কর্মহীন হয়ে পড়েন। দেখা যায় চরম আর্থিক সংকট।
১৭৭০ সালে ভয়াবহ এই চিত্রের থেকে বাদ যায়নি বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজবংশ। গ্রামের পর গ্রাম মানুষ সর্বহারা হয়ে খাদ্য সংকটে অনাহারে দিন কাটাতে শুরু করেন। রাজ্যের অর্থনীতি, কৃষি ও জনজীবন প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজবংশে চৈতন্য সিংহ খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে একরকম দিশেহারা। নিজেকে নগরদেবতা মদনমোহনের চরণে সঁপে দিয়েছিলেন। অবিভক্ত বাংলায় পূর্ণিয়া ও বিষ্ণুপুর প্রবলভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। মল্লভূমের সমৃদ্ধি প্রায় পথে নেমে আসে। রাজকোষ শূন্য, রাজা চৈতন্য সিংহ নিজেই দেখছেন হাতের বাইরে চলে গেছে রাজ্যের পরিস্থিতি। প্রখর গরমে বিষ্ণুপুরবাসী কখনো জলের অভাব বোধ করেনি। রাজ্যের চারিদিকে রাজারা সাতটি বাঁধ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের এমন পরিহাস যে সেই রাজ্যবাসীকে খাদ্যের অভাবে অনাহারে মরতে হয়েছিল। বৈষ্ণব মল্লরাজ চৈতন্য সিংহ সাধারণত ধর্ম কর্ম নিয়ে থাকতে ভালবাসতেন। উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। তাঁর সভাগায়ক ছিলেন রামশংকর ভট্টাচার্য। বিষ্ণুপুরে রাজা চৈতন্য সিংহ মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। সেই সময় ব্রাহ্মণদের রাজা একাধিক করমুক্ত জমি প্রদান করেন। প্রজাদের কল্যাণে বহু জনহিত কাজ করে গেছেন। দুর্ভিক্ষের সময়কালে রাজা সাধারণ প্রজাদের জীবন রক্ষা করতে পারছিলেন না। একরকম অসহায় অবস্থা। রাজ্যের পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে শুরু করে। এরকম অবস্থায় মীরজাফরের সৈন্য একদিন বিষ্ণুপুর আক্রমণ করলেন। তখন রাজবংশের অন্দরে ঘটলো ষড়যন্ত্র নামক বিষয়টির আবির্ভাব। রাজা নগরদেবতা মদনমোহনকে সঙ্গে নিয়ে বিষ্ণুপুর পরিত্যাগ করলেন। নগরদেবতাকে নিয়ে রাজা আসলেন কলকাতার বাগবাজারে। সাহেব কলকাতার রাস্তায় ততদিনে হাহাকারের চিত্র।

চৈতন্য সিংহ দ্বারা নির্মিত বিখ্যাত রাধাশ্যাম মন্দির, বিষ্ণুপুর
কলকাতার বাবুদের নিয়ে সেকালের বাগবাজার। একদিকে শোভাবাজারের নবকৃষ্ণ দেব। অন্যদিকে তাঁর বাসস্থানের ঠিক কাছে ব্যবসায়ী গোকুল চন্দ্র মিত্র থাকতেন। এই গোকুল মিত্রিরের কাছে এলেন রাজা চৈতন্য সিংহ। তিনি তাঁর নগরদেবতাকে বন্ধক রেখে ১.৩ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য পেলেন। পরবর্তীতে যতদিন ঋণ পরিশোধ করতে রাজা পারেননি সেই মূর্তি গোকুল মিত্রিরের কাছেই রয়ে গেল। ওইদিকে বিষ্ণুপুরের মানুষেরা একটি সময়ের পর ধৈর্য হারালেন। তিনি যে নগরের রক্ষাকর্তা! সেই স্থানের নিরাপত্তা মদনমোহনের ওপর। আশ্চর্য হলেও এমন ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। শোনা যায়, ভয়ানক বর্গী বাহিনীকে এক রাত্রের মধ্যে দলমাদল কামান দিয়ে নগরদেবতা গোলাবর্ষণ করে বিতাড়িত করেছিলেন।
বিষ্ণুপুরবাসীর লোকগানে খেদোক্তি পাওয়া যায়,
বাগবাজারের মদনমোহন রহিলেন ব’সে/বিষ্ণুপুরের শ্রীমন্দিরে পাথর পড়ে খসে।। রাজা কাঁদে, রাণী কাঁদে, কাঁদে প্রজাগণ।পূজারি ব্রাহ্মণ কাঁদে, হয়ে অচেতন।। হাতিশালে হাতি কাঁদে, ঘোড়া না খায় পানি। /বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে চৈতন্যের রানী। /রাস হয়না, দোল হয়না, আর না আসে যাত্রী। /কিবা প্রেমের বেড়ী তোমায় দিয়াছে গোকুল মিত্রি।।
বিখ্যাত ব্যবসায়ী গোকুল মিত্রিরের সোনার সিংহাসনে নগরদেবতার অধিষ্ঠান। রোজ খান চিনির পানা। ওদিকে বিষ্ণুপুরে সকলে মদনমোহনের অপেক্ষায়। কবে আসবেন তাদের নগরদেবতা। অবশেষে এলো সেই দিনটি। রাজা চৈতন্য সিংহ সকল ঋণ পরিশোধ করলেন। মিটিয়ে দিলেন সব দায়ভার। যথাস্থানে নগরদেবতাকে ফিরিয়ে নিয়ে চললেন। পথে একদিন দৈব আদেশ এলো, যে মূর্তিটি নিয়ে তিনি চলছিলেন সেটি গোকুল মিত্রিরের বানানো। হুবহু দেখতে একেবারে একইরকম মূর্তি। আবার রাজা ফিরে এলেন কলকাতায়। গোকুল মিত্রির কিছুতেই মূর্তি হাতছাড়া করবেন না। তাঁর বিশ্বাস হয়েছিল এই মূর্তি ভাগ্যপ্রদ। শেষে রাজা অনেক অনুনয়-বিনয় করে ফিরিয়ে নিয়ে চললেন আসল মদনমোহনকে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিষ্ণুপুরবাসী পেলেন নগরদেবতাকে। তবে এরপরেও রাজা চৈতন্য সিংহ সেভাবে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।

বাগবাজারে গোকুল চন্দ্র মিত্রের মদনমোহন জীউ
গোকুল মিত্র ১৭৬১ সালে আটকোনা রাসমঞ্চ সহ সুবিশাল মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। বিষ্ণুপুরে আজকের শ্রীশ্রীমদনমোহন রাধিকা মূর্তিটি পরবর্তীতে নির্মাণ হয়েছে। পুরনো মূর্তিটি চুরি হয়ে যায়। সেই মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজা বীর হাম্বির। বুকের ভিতর মর্মবেদনা নিয়ে তবু বিষ্ণুপুরবাসীর নগরদেবতা পুজো পান। পোড়ামাটির মন্দির পুজো-পাঠ, প্রার্থনা, আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে বহু ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে। স্থান মাহাত্ম্যে সে কত উঁচুতে। দিনের আলো মুছে গেলে, মন্দিরের চূড়ার ঠিক পাশে জেগে ওঠে চাঁদ। আরতির শাঁকঘন্টা শেষে পাখিদের রব ক্রমশ হারিয়ে যায়। ভেসে ওঠে তখন শুধুই স্মৃতি। ভক্তরা সমর্পণ করেন নগরদেবতার কাছে নিজের সব চাওয়া। তিনি অন্তর্লোক আলোকিত করেন।
তথ্যসূত্র: কবিভূষন শ্রীপূর্নচন্দ্র দে, অমিয়কুমার বন্দোপাধ্যায়, রাধারমণ মিত্র










