অমল মাজি
একসময় তিনি ছিলেন দলের ‘পাওয়ার সেন্টার’। তাঁর এক ডাকে সভা-মিছিল উপচে পড়ত, তাঁর গাড়ির পেছনে ৩০ টি কনভয়ের পাশাপাশি ছুটত হাজার হাজার অনুগামী। কেউ বলতেন “আমার বস”, কেউ “আমার নেতা”, কেউ বলতেন “আমাদের যুবরাজ”, আবার কেউ প্রকাশ্যে নিজেকে “অভিষেক অনুগামী” বলেই পরিচয় দিতেন। কিন্তু, কি আশ্চর্য্য, রাজনীতির চাকা ঘুরতেই কি বদলে গেল সব সমীকরণ?
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি আক্রান্ত হওয়ার পর যেভাবে বড় মাপের প্রতিবাদ, রাস্তায় নামা বা চোখে পড়ার মতো দলীয় ক্ষোভ কর্মসূচি খুব একটা সামনে আসেনি, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা চলছে। প্রশ্ন উঠছে, যে নেতাকে ঘিরে একসময় এত ‘আবেগ’, এত ‘ভক্তি’, সেই নেতার কঠিন সময়ে এত নীরবতা কেন?
‘বস’ থেকে ‘দূরত্ব’, তেল মারা রাজনীতির নগ্ন বাস্তব?
রাজনৈতিক অন্দরমহলে অনেকেই বলছেন, এটা আসলে বাংলার রাজনীতির এক চেনা রোগ, ক্ষমতার সঙ্গে আনুগত্যের সরাসরি সম্পর্ক। যতদিন ক্ষমতা, প্রভাব, পদ-পদবি, টেন্ডার, সুপারিশ বা রাজনৈতিক সুবিধার সম্ভাবনা থাকে, ততদিন নেতার চারপাশে ‘ভক্তদের’ ভিড় লেগেই থাকে। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদল হতেই, সেই চেনা মুখগুলোর বড় অংশ যেন হঠাৎ অদৃশ্য!
একসময় যারা সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন পোস্ট করে “আমার নেতা”, “আমার অভিষেক”, “তুমি এগিয়ে চলো” লিখতেন, তাঁদের প্রায় সকলেই আজ নীরব, এমন অভিযোগও উঠছে রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের একাংশের মধ্যেই।
প্রশ্নটা সোজা, এরা কি আদর্শের সৈনিক, নাকি সুবিধার ব্যবসায়ী? নাকি ধান্দাবাজ?
রাজনীতির ‘মৌমাছি তত্ত্ব’!
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজনীতিতে এক ধরনের “মৌমাছি সংস্কৃতি” কাজ করে। যেখানে ক্ষমতা মানে মধু, আর নেতাকে ঘিরে থাকা বহু মানুষ আসলে সেই মধুর ভাগীদার হওয়ার আশাতেই ভিড় করে। মধু শুকিয়ে গেলে চাকও ফাঁকা হতে সময় লাগে না।
ইতিহাস বলছে, শুধু তৃণমূল নয়, প্রায় সব দলেই ক্ষমতা থাকলে “স্যার-স্যার” করা লোকের অভাব হয় না। কিন্তু সময় খারাপ হতেই ফোন ধরেন না অনেকেই। রাজনৈতিক আনুগত্যের এই “সিজনাল রোগ” বহুবার সামনে এসেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অভিষেক কি ভুল মানুষদের বিশ্বাস করেছিলেন? না ক্ষমতার অহংকারে, ক্ষমতার দম্ভে মানুষের সঙ্গে, দলের নেতা – কর্মীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলেন?
রাজনৈতিক মহলে এখন ফিসফাস, যাঁদের অনেককে সামনে এনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, পদ দেওয়া হয়েছিল, রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি হয়েছিল, তাঁদের একাংশই কি এখন দূরত্ব বজায় রাখছেন? যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে এটি শুধু একজন নেতার ব্যক্তিগত ধাক্কা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক শিবিরের ভেতরের বাস্তব ছবিও তুলে ধরে।
ক্ষমতা থাকলে সবাই ‘আপনার’, ক্ষমতা গেলেই ‘কে আপনি?’
রাজনীতির সবচেয়ে নির্মম সত্য হয়তো এটাই। ক্ষমতার আলো জ্বললে চারপাশে অসংখ্য মানুষ, প্রশংসা, আনুগত্য, সেলফি আর স্লোগান। কিন্তু আলো নিভতেই অনেকেই নতুন সূর্যের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন প্রশ্ন একটাই,
অভিষেককে ঘিরে নীরবতা কি কেবল পরিস্থিতির ফল, নাকি তৃণমূলের তথাকথিত ‘বিশ্বস্ত সৈনিকদের’ সুবিধাবাদী চরিত্র সামনে এনে দিল?
সময়ই হয়তো তার উত্তর দেবে।










