পর্ব ১
মুকুট তপাদার
রাঢ়বঙ্গের মাটির পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস। এর সঙ্গে সংস্কৃতি আর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। আর তার প্রবেশদ্বার হলো বর্ধমান। স্টেশন চত্বরে পা রাখতেই বিস্তর গাড়ি, ট্রেকার, বাস, টোটো আর অটোদের জটলা সমবেতভাবে আপনাকে স্বাগত জানাবে। স্টেশন চত্বরে গাড়ি প্রচুসংখ্যক দাঁড়িয়ে থাকে, নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য চালককে জানালে একেবারে স্থানীয় তথ্য দিয়ে সাহায্য করে দেয়।
বর্ধমান রাজপরিবারের লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরের রথযাত্রা মহোৎসব বিখ্যাত। ঐতিহ্যবাহী রাজ পরিবারের এই রথযাত্রার গুরুত্ব নেহাত কম নয়। বলা হয়ে থাকে বর্ধমানের সবচেয়ে পুরনো রথযাত্রা উৎসব। স্টেশন থেকে গাড়ি নিয়ে সোনাপট্টি এলাকায় এলেই দেখা মিলবে রাজবাড়ির লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দির। নাট মন্ডপের একাংশ বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভেঙ্গে পড়েছে। বেশ কিছুদিন আগেও মহারাজা মেহতাব চাঁদের নির্মিত আয়তনে বিশাল মন্ডপটির সৌন্দর্য দেখবার মত ছিল। এই মন্দিরের ভেতরেই থাকে দুইটি রাজা ও রাণীর রথ।
ঐতিহাসিক বর্ধমান রাজবাড়ির আদি ইতিহাসের খোঁজে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে কাঞ্চননগরে, যেখানে এই রাজবংশের আদি বাসস্থান। দামোদরের বারংবার বন্যার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তীতে রাজারা তাঁদের মূল কেন্দ্রটি কাঞ্চননগর থেকে সরিয়ে শহরের উত্তর ফটক এলাকার এক নিরাপদ ও উঁচু স্থানে স্থানান্তরিত করেন। বর্ধমান জেলার এক ঐতিহাসিক জনপদ ছিল কাঞ্চননগর। বাঙালি মাত্রই কাঞ্চননগরের নাম শুনলে সত্যজিৎ রায়ের ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ চলচ্চিত্রের সেই বিখ্যাত দৃশ্যটি মনে পড়বেই। মগনলাল মেঘরাজের আস্তানায় জটায়ুর গলায় ছুরি ঘোরানোর সেই রোমহর্ষক খেলায় অবতীর্ণ হয়েছিল হরবন্সপুরের রাজার দল থেকে আসা এক খিলাড়ি। সেই ধারালো ছুরি দেখে জটায়ুর মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিঃসৃত হয়েছিল সেই কালজয়ী উক্তি- “কাঞ্চননগরের ছুরি?”। সত্যিই, এককালে কাঞ্চননগরের ছুরি-কাঁচি শিল্পের সুখ্যাতি ছিল আকাশছোঁয়া।
রাজা কীর্তিচাঁদ রায় চিতুয়াবরদার বিদ্রোহী শাসক শোহা সিংহকে যুদ্ধে পরাস্ত করে পুরনো রাজপ্রাসাদের চারপাশে বিজয় স্মারক হিসেবে বারোটি গেট নির্মাণ করেছিলেন। দামোদরের বিধ্বংসী বন্যার জলের তোড়ে বাকি এগারোটি গেট বিলীন হয়ে গেলেও, ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাঞ্চননগরের একমাত্র ‘বারোদুয়ারী গেট’।
কাঞ্চননগরের রথযাত্রা ঐতিহাসিক। পুরনো রথ আজ আর নেই। এখানে রথতলা মোড় বলে একটি জায়গা রয়েছে সেখানে একসময় রাজা কীর্তিচাঁদ রায়ের সময়কালে রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল। সেই স্মৃতি আজও বহমান।
(চলবে)










