নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপড়েন, কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাপট আর উত্তর থেকে দক্ষিণ চষে ফেলা হেভিওয়েটদের প্রচারের পর অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ বুধবার সকাল ৭টা থেকেই শুরু হয়েছে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় তথা শেষ দফার ভোটগ্রহণ। ২৯৪টি আসনের মধ্যে বাকি থাকা ১৪২টি আসনেই আজ নির্ধারিত হবে আগামী পাঁচ বছরের বাংলার ভাগ্য। প্রথম দফায় ৯৩.১৭ শতাংশের রেকর্ড ভোটদানের পর আজ সকাল থেকেই বুথে বুথে ভোটারদের লম্বা লাইন বুঝিয়ে দিচ্ছে, এই দফাও আক্ষরিক অর্থেই হতে চলেছে ‘হাই-ভোল্টেজ’। মূল লড়াই মূলত দ্বিমুখী— একদিকে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে নিজেদের গড় রক্ষা করার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে বিজেপির কাছে দক্ষিণবঙ্গের দুয়ার খুলে নবান্ন দখলের স্বপ্ন। তবে বাম-কংগ্রেস জোটও বেশ কিছু আসনে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই প্রধান শিবিরের কাছে।
গত ১৫ বছর ধরে দক্ষিণবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দক্ষিণবঙ্গের ৭৭টি আসনের মধ্যে বিজেপি মাত্র ১৮টি আসনে জয়লাভ করেছিল। কলকাতা, হাওড়া, দুই ২৪ পরগনা, নদিয়া, হুগলি এবং পূর্ব বর্ধমানের মতো জেলাগুলোই শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয়ের প্রধান কারিগর ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি এবার তাদের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করেছে এই দুর্গ ভাঙতে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ— বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গত কয়েক সপ্তাহে দক্ষিণবঙ্গের প্রতিটি অলিতে-গলিতে প্রচার চালিয়েছেন। তাঁদের লক্ষ্য পরিষ্কার, উত্তরবঙ্গের সাফল্যকে এবার দক্ষিণবঙ্গেও ছড়িয়ে দেওয়া। অন্যদিকে, তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রতিটি জেলায় জনসভা করে নিজের ঘাঁটি আগলাতে কোনো খামতি রাখেননি। এবারের নির্বাচনের সবথেকে বড় আকর্ষণ ভবানীপুর কেন্দ্র। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে যে স্নায়ুযুদ্ধ দেখা গিয়েছিল, এবার ভবানীপুরে তারই পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। একদিকে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যদিকে তাঁরই প্রাক্তন সেনাপতি এবং বর্তমান বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামে হারের ক্ষত মুছে ফেলা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনই শুভেন্দু অধিকারীর কাছে এটি প্রমাণ করার লড়াই যে, তিনি একাই শাসক শিবিরের ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম।
ভবানীপুর ছাড়াও বেশ কিছু আসনে আজ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। টালিগঞ্জে রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের মুখোমুখি বিজেপির পাপিয়া অধিকারী। কলকাতা পোর্টে ফিরহাদ হাকিমের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির রাকেশ সিং। উত্তর ২৪ পরগনার নোয়াপাড়ায় অর্জুন সিংহ বনাম তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যের লড়াইও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কামারহাটিতে মদন মিত্রের ভাগ্যও আজ ইভিএমে বন্দি হতে চলেছে। এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর। কমিশন প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ২৪ পরগনায় প্রায় ১২.৬ লক্ষ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ১০.৯১ লক্ষ নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এমনকি খোদ কলকাতাতেও ৬.৯৭ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা ঘিরে উত্তাল রাজনৈতিক মহল। অনেক আসনেই এই বাদ পড়া ভোটারদের সংখ্যা গতবারের জয়ের ব্যবধানের থেকেও অনেক বেশি। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু পকেটে ভোটের মেরুকরণ এবং সামগ্রিক ফলাফলে বড়সড় রদবদল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রথম দফার ভোটে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিচ্ছিন্ন হিংসার ঘটনার পর দ্বিতীয় দফায় কমিশন কোনো ঝুঁকি নিতে নারাজ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাজা বোমা উদ্ধারের ঘটনা প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সাফ জানিয়েছেন, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে ভোটের ফল প্রকাশের পরও অন্তত ৬০ দিন রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকবে। আজকের ১৪২টি আসনের জন্য কয়েক হাজার কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশের বিশাল বাহিনী প্রতিটি বুথে নজরদারি চালাচ্ছে। বিজেপির কাছে এই দফার ভোট আসলে দক্ষিণবঙ্গে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের শেষ সুযোগ। আর তৃণমূলের কাছে এটি টানা চতুর্থবার নবান্নে ফেরার চূড়ান্ত পরীক্ষা। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার মোট ৬৪টি আসনই সম্ভবত স্থির করে দেবে বাংলার পরবর্তী শাসক কে হবেন। আজ বুধবারের ভোটগ্রহণ শেষ হলেও বাংলার মানুষের নজর থাকবে আগামী ৪ মে ফলাফলের দিকে।









