মুকুট তপাদার
দক্ষিণবঙ্গের অধিকাংশ জেলায় বইছে গরম বাতাস। আর তীব্র গরমের মাঝে ভোট। বৈশাখে প্রকৃতি নির্মম। পরম উল্লাসে তার শাসনদৃষ্টি আর যে সহ্য হয় না। বৈশাখে ভোট রঙ্গে একজন মহান ব্যক্তিত্বকে স্মরণ নিতেই হয়, তিনি হলেন দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিত। ভোট এলে তাঁর রসিকতা ও পর্যবেক্ষণ আজো নানা ভূমিকায় উন্মোচিত হয়।
ভোটের উত্তাপ মুর্শিদাবাদ জেলায় সর্বত্র। সেই মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরেই রসিক দাদাঠাকুরের জন্মস্থল। আজকের মুর্শিদাবাদ কি ভুলেছে দাদাঠাকুরের কথা? এখনো ইতি উতি ছড়িয়ে আছে জেলার বিভিন্ন জায়গায় তাঁর দুই একটি মূর্তি। সেসবই অবহেলায় পড়ে।
হাস্যকৌতুক তাঁর সাহিত্যের মূলধন, সঙ্গে প্রতিটি লেখাতেই তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য এবং সাংঘাতিক পর্যবেক্ষণ শক্তি সাবলীলভাবে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সকলেই তাঁর সাহিত্যের অনুরাগী।
আশ্চর্যজনক ভাবে এই বৈশাখ মাসেই দাদাঠাকুর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর একইদিনে জন্ম ও মৃত্যুদিনটি। ২৭ এপ্রিল দিনটি রসিকচূড়ামণিকে স্মরণ করা হয়।
দাদাঠাকুর তাঁর নিজস্ব পত্রিকা ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’-এর মাধ্যমে এক বিশেষ প্রক্রিয়াতে খবর পরিবেশন শুরু করেছিলন। তিনি কখনই রাজনৈতিক চর্চা বা ব্যক্তিগত কুৎসার রাস্তায় হাঁটেননি। বরং তাঁর লেখার মূল লক্ষ্যটি ছিল সমাজকে সচেতন করতে হবে রসসাহিত্যর মধ্য দিয়ে। বাংলা ভাষায় সংবাদ রচনায় তাঁর অবদান ও সম্পাদনা শ্রেষ্ঠ।
জঙ্গিপুর সংবাদে লেখা হয়, জনান্তিকে শোনা গেল: বলতে পারেন দেশে হচ্ছে কি? উত্তর ছিল, গণতন্ত্রের চোয়াঢেঁকুর।
দাদাঠাকুর ভোট নিয়ে লেখেন, ‘ভোট দিয়ে যা, আয় ভোটার আয়/ মাছ কুটলে মুড়ো দিব, গাই বিয়ালে দুধ দিব/ দুধ খাবার বাটি দেব…’। ভোট রঙ্গে দাদাঠাকুর গান লিখেছিলেন, যেমন – “আমি ভোটের লাগিয়া ভিখারী সাজিনু/ ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে…”
শাসকগোষ্ঠীর ভুল ত্রুটিগুলোকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তাঁর রচনায় উঠে আসে রসবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অপূর্ব সমন্বয়। সেযুগে বিপ্লবীদের সঙ্গেও দাদাঠাকুরের যোগাযোগ ছিল।
‘বিদূষক’ ও ‘বোতল পুরাণ’ ছিল তাঁর আরো দুটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পত্রিকা।
দাদাঠাকুর বিশ্বাস করতেন, সংবাদপত্র কেবল শুধুমাত্র তথ্য পরিবেশনের জন্য নয়। যা সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তাই তিনি তাঁর পত্রিকাকে ব্যবহার করেছিলেন জনতা জনার্দনের চেতনাকে জাগ্রত করবার জন্য। নিজের বাড়িতেই তিনি একটি ছাপাখানা খুলেছিলেন। তাঁর ছাপাখানার নাম ছিল ‘পণ্ডিত প্রেস’। বিজ্ঞাপনে লেখা থাকতো ‘সকল প্রকার ছাপার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান’।
জঙ্গিপুর সংবাদে ‘পথে না বিপথে’? খবরে লেখা হয়, যেমন – “এই রাজ্যে প্রশাসন কোন স্তরে উপনীত তাহা নিরপেক্ষ প্রথম পুরুষ বহুবচন মাত্রই জ্ঞাত আছেন।” সে বিষয়ে আরো লেখা হচ্ছে যেমন – “প্রাণের দায় সেদিন বিধানসভা ভবন ‘পালাও পালাও’ রবে মুখর হইয়া উঠে। স্পীকার হইতে শুরু করিয়া সাধারণ কর্মী পর্যন্ত ‘জান’ লইয়া মান বাঁচানোয় উৎকণ্ঠিত।”
পরনে ধুতি-চাদর পরিহিত এই মানুষটি তাঁর লেখার মাধ্যমে সমাজে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক অথচ তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ প্রকাশ করতেন। তবে এই প্রতিবাদ কখনোই কড়া ভাষায় নয়, বরং রসিকতার মাধ্যমে। যা চিন্তাশীল পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে। তারমধ্যে ধরিয়ে দেওয়া থাকতো ভুলগুলো।
এইভাবে জঙ্গিপুর সংবাদ শুধুমাত্র একটি পত্রিকা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা হয়ে উঠেছিল সামাজিক সচেতনতার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।










