Home / প্রবন্ধ / শেষ ৬ বছরে নির্বাচনী হিংসায় শীর্ষে বাংলা

শেষ ৬ বছরে নির্বাচনী হিংসায় শীর্ষে বাংলা

অমল মাজি

এ বারের বিধানসভা ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়েছে গত ১৫ মার্চ। তার পরে ঠিক তিন দিনের মাথায় এক তৃণমূল বুথ সভাপতি খুন হয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনায়। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এর নেপথ্যে রয়েছে দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। তবে এই একটি ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। ভোট যত এগিয়েছে, তত অশান্তির খবর আসছে রাজ্যের নানা দিক থেকে। গত ছয় বছরের জাতীয় পরিসংখ্যান বলছে, নির্বাচনী হিংসার নিরিখে দেশের মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ এখন শীর্ষে।

পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘এসিএলইডি’ (আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা)-র তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচন ছিল গত কয়েক বছরের মধ্যে দেশের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী নির্বাচন। সে বার বাংলায় ৩০০টি হিংসার ঘটনা এবং ৫৮ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছিল। যা কি না দেশের অন্য যে কোনও রাজ্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। তুলনায় ২০২৪-এর অন্ধ্রপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে ৮৯টি হিংসার ঘটনা এবং মাত্র ৩ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। ২০২০ সাল থেকে ভারতে যত নির্বাচনী হিংসা ও মৃত্যু হয়েছে, তার অর্ধেকের বেশি ঘটেছে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই। দেশে মোট ৩২৯টি প্রাণহানির ঘটনার মধ্যে ১৬৮টিই ঘটেছে এই রাজ্যে।

বড় রাজ্যগুলির সঙ্গে তুলনা করলে বাংলার এই ছবি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ২০২১-এর নির্বাচনে এ রাজ্যে প্রতি বিধানসভা কেন্দ্রে গড় হিংসার হার ছিল ১.০২। ওদিকে ২০২২-এর উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে ৪০৩টি আসনের বিপরীতে হিংসার ঘটনা ছিল মাত্র ৫০টি। বিহার, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক বা রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলিতে সাম্প্রতিক নির্বাচনে এই সংখ্যা ৪০-এর গণ্ডিও পেরোয়নি। ২০২১-এর এপ্রিল মাসে যখন দফায় দফায় ভোট চলছিল, সেই এক মাসেই ১২৩টি হিংসার ঘটনা ও ১৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। এমনকি ফল প্রকাশের পর মে মাসেও হিংসার বিরাম ছিল না। তথ্যের খাতিরে দেখা যাচ্ছে, ওই সময় বেশির ভাগ হামলাই ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক। আদালত সূত্রের খবর, গত ভোটের সময় সাত সপ্তাহে ভোট পরবর্তী হিংসায় ১,৯৩৫টি অভিযোগ দায়ের হয়। অভিযুক্ত ৯,৩০৪ জন। এত দিনে গ্রেপ্তার হয়েছে ১,৩৪৫ জন। হাই কোর্টের নির্দেশে খুনের ঘটনায় ৫২টি মামলা এবং ধর্ষণের ঘটনায় ৩৯টি মামলার তদন্ত শুরু করেছিল সিবিআই।

নির্বাচনী এই হানাহানির কুশীলব কারা? পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সাল থেকে যত হিংসার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে অন্তত ৭৭টিতে শাসক দল তৃণমূল এবং ২৫টিতে বিজেপি-র সরাসরি নাম জড়িয়েছে। তবে এর বাইরেও একটি বড় অংশের অশান্তি ঘটিয়েছে ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ দুষ্কৃতীরা। এ বছর অর্থাৎ ২০২৬-এর নির্বাচনী নির্ঘণ্ট অনুযায়ী আগামী ২৩ এপ্রিল এবং ২৯ এপ্রিল, দুই দফায় ভোটগ্রহণ হবে রাজ্যে। ফলাফল ৩ মে। ইতিমধেয়ই গত ২৭ মার্চ পর্যন্ত অন্তত ৪০টি অশান্তির খবর মিলেছে। উত্তর ২৪ পরগনা এবং বীরভুমের মতো জেলাগুলিতে তৃণমূল ও বিরোধীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের খবর পাওয়া গিয়েছে। মন্দের ভালো, এর মধ্যে প্রাণহানির ঘটনা এখনও ঘটেনি।

খোদ কলকাতা এবং হুগলির কয়েকটি জায়গায় পতাকা ছেঁড়া ও দলীয় কর্মীদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, উত্তর দিনাজপুরের চোপড়াতেও তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। সেখানে দেওয়াল দখলকে কেন্দ্র করে পাথর ছোড়া ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটেছে। তবে নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই বাংলার ভোট-রাজনীতিতে মালদহ জেলা এখন সবথেকে তপ্ত। গত ১ এপ্রিল কালিয়াচকের বৈষ্ণবনগর এবং মোথাবাড়ি এলাকায় ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করতে গিয়ে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা সাতজন বিচারবিভাগীয় আধিকারিককে দীর্ঘক্ষণ ঘেরাও করে রাখে। এই ঘটনায় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশের পর নির্বাচন কমিশন এই ঘটনার তদন্তভার এনআইএ-র হাতে তুলে দিয়েছে। পুলিশ এই ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে মোফাক্কেরুল ইসলাম নামে এক আইনজীবীসহ ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ইতিমধ্যে, এই ঘটনায় ২৫ পাতার একটি প্রাথমিক রিপোর্ট সুপ্রিম কোর্টে জমা করেছে এনআইএ।

২০২১-এর আট দফার ভোটের বদলে এ বার নির্বাচন হচ্ছে মাত্র দুই দফায়। সময় কম পাওয়ায় হিংসার দাপট আগের চেয়ে কিছুটা কমবে কি না, তা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। নির্বাচন শুরু হওয়ার আগেই রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আদালত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বলেছে সুপ্রিম কোর্ট। হিংসা নিয়েও চিন্তিত নির্বাচন কমিশনও। এর আগেই তারা জানিয়েছিল, ভোটের আগের হিংসা, ভোটের সময়ের হিংসা ও ভোট পরবর্তী হিংসা। সব ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেবে তারা। জানানো হয়েছে, ফলপ্রকাশের পরেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিরাট সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে থাকবে। জানা গিয়েছে, ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরেও রাজ্যে ৫০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকবে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতেই এই সশস্ত্র বাহিনীকে মোতায়েন করে রাখা হবে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার স্পষ্ট জানিয়েছেন, যে সব পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে অতীতে হিংসায় মদত দেওয়ার অভিযোগ ছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, কিছুদিন আগে জাতীয় নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে ২০২১-এর ভোট পরবর্তী হিংসার ঘটনা নিয়ে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছিল, যেখানে সেই সময়ে দায়িত্বে থাকা পুলিশ আধিকারিকদের নামের তালিকা চাওয়া হয়েছিল। সেই সময়ে কর্তব্যে অবহেলার দায়ে অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনও বিভাগীয় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হয়েছিল কি না, রাজ্যের কাছ থেকে সেই তথ্যও চেয়েছিল কমিশন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার আরও জানিয়েছেন, এ বার বাংলা ‘হিংসামুক্ত’ ভোট দেখবে। সেটা অবশ্য সময়ই বলবে!

ফিচার ইমেজ: পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসার ঘটনা। ছবি সৌজন্যে মিলেনিয়াম পোস্ট

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *