আসানসোল: কয়লা পাচার মামলায় আবারও সক্রিয় কেন্দ্রীয় এজেন্সি ইডি।
মঙ্গলবার সাতসকালেই বাংলার একাধিক জায়গায় অভিযানে নামে ইডি। কয়লা পাচার মামলায় দুর্গাপুর, আসানসোল, বর্ধমান, দিল্লি সহ ৯টি জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছে ইডি ।
সূত্রের খবর, কয়লা পাচারের কালো টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে কোনপথে কার কার কাছে গেছে, তার খোঁজেই এই অভিযান ইডির।
এছাড়াও কয়লা পাচারে প্রোটেকশন মানি কারা নিত, কার মাধ্যমে তা হত সেই বিষয়টির খোঁজেও চলছে অভিযান।
এ দিন দুর্গাপুরে পৌঁছে যান এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির আধিকারিকরা। তাদের সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা।
মঙ্গলবার সকালে দুর্গাপুর মহকুমার একাধিক জায়গায় হানা দেয় ইডি বিশেষ দল।
একইভাবে, অভিযান চলে পান্ডবেশ্বরের কয়লা ব্যবসায়ী শেখ মইদুল, জামুড়িয়ায় ব্যবসায়ী রাজেশ বনশল, কাঁকসার হাসিম মির্জা রেজা ও রানিগঞ্জের কিরন খানের বাড়িতে।
ইডি সূত্রের খবর জামুড়িয়ায় রাজেশ বনশলের বাড়ি থেকে তিন বস্তা প্রায় ১ কোটি টাকার মতো নগদ টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ নথি পাওয়া গেছে।
দুপুর তিনটের পরে ওই ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে তিনটি হলুদ রঙের বস্তা হাতে দুজন ইডির আধিকারিক বের হন। তাদের পাহারা দিয়ে ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যান কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা।
মনে করা হচ্ছে, এই তিনটি বস্তার ভেতরে রয়েছে উদ্ধার হওয়া টাকা ও নথি। এর আগে এসবিআইয়ের তিনজনকে দেখা যায়, এই হলুদ রঙের বস্তা নিয়ে ব্যবসায়ীর বাড়িতে ঢুকতে। পরে জানা যায়, তাতে টাকা গোনার মেশিন রয়েছে।
এদিন সকালে সদ্য বুদবুদ থানার ওসির দায়িত্ব পাওয়া মনোরঞ্জন মণ্ডলের দুর্গাপুরের অম্বুজানগরীর বাড়িতে হানা দেন ইডি আধিকারিকরা। কয়েকদিন আগেই বুদবুদ থানায় পোস্টিং পেয়েছেন মনোরঞ্জন মণ্ডল। তবে তিনি এখনও চার্জ নেননি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ইডি আধিকারিকরা বলে জানা যায় ।
তাঁর গোটা বাড়ি ঘিরে রাখে কেন্দ্রীয় বাহিনী। সিটি সেন্টার ফাঁড়ির অফিসার ইনচার্জ সুদীপ্ত বিশ্বাস ইডির অভিযানের খবর পেয়ে মনোরঞ্জন মণ্ডলের বাড়িতে পৌঁছান। তিনি ইডির আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেন। মিনিট পনেরো পরে তিনি ওসির বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এই ওসির বাড়ি থেকে কি কি পাওয়া গেছে, তা জানা যায় নি।
উল্লেখ্য, এই মনোরঞ্জন মন্ডলকে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে বারাবনি থানার ওসি পদে থাকাকালীন তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছিল। এরপরে, তাকে আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের এসবি বা স্পেশাল ব্রাঞ্চ- এ এসআই পদে আনা হয়েছিল। সেখান থেকে তাকে দিন কয়েক আগেই বুদবুদ থানার ওসি করা হয়। এই মনোরঞ্জন মন্ডলের সঙ্গে শাসক দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে অভিযোগ।
বারাবনি থানার ওসি থাকাকালীন ওসির চেম্বারে বারাবনির এক শাসক দলের নেতার জন্মদিন পালন করে তিনি বিতর্কে জড়ান।
এছাড়া দুর্গাপুরে সেপকো টাউনশিপে বালি কারবারি প্রবীর দত্তর বাড়িতে এ দিন সকাল ছ’টা নাগাদ হানা দেন ইডির আধিকারিকরা। সিটি সেন্টার অঞ্চলে অম্বেদকর সরণিতে একটি বাড়িতেও হানা দেয় ইডির আধিকারিকদের একটি দল।
এর পাশাপাশি পান্ডবেশ্বর ও কাঁকসা থানার ১৯ নম্বর জাতীয় সড়কের দুই ব্যবসায়ীর বাড়িতে আসেন ইডির আধিকারিকরা। দুজনের মধ্যে এক ব্যবসায়ী অজয় ও দামোদর নদী থেকে বালি উত্তোলন করে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করে। সরকারি নিয়ম মেনে টেন্ডারে অংশ নিয়ে বৈধ বালি ঘাট থেকে বালি তোলার পাশাপাশি অভিযোগ একাধিক জায়গায় অবৈধ ভাবে বালি উত্তোলন করে পাচার করা হতো বলে অভিযোগ।
এছাড়া বালির চালান জালিয়াতি করার অভিযোগ উঠেছে এইসব বালি কারবারিদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, বীরভূমের বালির চালান দিয়ে পশ্চিম বর্ধমান জেলায় বালি পাচার করত। এছাড়া একটা চালান দিয়ে একাধিকবার বালি পাচারের করত বলে অভিযোগ। এই ভাবে এইসব বালির কারবারিরা প্রচুর সম্পত্তি করেছে বলে অভিযোগ।
একই সঙ্গে, এদিন সকালে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডির আধিকারিকরা আসানসোলের জামুরিয়া ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলা এলাকার সাবান ফ্যাক্টরি লেনে হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী রাজেশ বনসালের বাড়িতে অভিযান আসেন।
সূত্রের খবর, এদিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে প্রায় ১৬ জন ইডির একটি দল তিনটি গাড়িতে রাজেশ বনসালের বাড়িতে পৌঁছায়। অভিযানের সময়, সিআইএসএফ নিরাপত্তারক্ষীরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। ১৩ সদস্যের একটি ইডি আধিকারিকদের একটি দল ওই ব্যবসায়ীর বাড়ির ভেতরে তল্লাশি চালালো শুরু করে।
খবর অনুসারে, রাজেশ বনসাল জামুরিয়া এলাকায় হার্ডওয়্যার ব্যবসার সাথে জড়িত এবং রানিগঞ্জ এলাকায় তার একটি হার্ডওয়্যার ব্যবসাও রয়েছে। কয়লা সংক্রান্ত অন্যান্য কার্যকলাপে তার আগে থেকে এই ব্যবসায়ী জড়িত আছে কিনা তা তদন্ত করছে ইডি।
তার নামে অবৈধ এবং হিসাব বহির্ভূত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তদন্ত করছে।
তবে, এদিন সকালে যখন জামুড়িয়ায় বশনল বাড়িতে ইডি আসে, তখন রাজেশ বনশল ছিলেন না৷ ওই বাড়িতে এই মুহুর্তে থাকেন তার ভাই অমিত বনশল।
প্রায় ১২ ঘন্টা অভিযান শেষ করে এদিন বিকেল পাঁচটা নাগাদ ইডির আধিকারিকরা জামুড়িয়ার ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।
বাকি সব জায়গায়, এই খবর লেখা পর্যন্ত চলছে বলে জানা গেছে।
ইডির এই অভিযানকে কেন্দ্র করে জামুড়িয়া হাটতলার পাশাপাশি কাঁকসা, পান্ডবেশ্বর, রানিগঞ্জ ও দুর্গাপুর এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। তবে, এদিনের অভিযানের কারণ বা তদন্তের পরিধি সম্পর্কে ইডি তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করা হয়নি।
তবে, এদিনের ইডির এই অভিযানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানওতোর শুরু হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছে বিজেপি। যদিও, শাসক দল পাল্টা কয়লা মাফিয়ার সঙ্গে বিজেপির যোগাযোগ নিয়ে তোপ দেগেছে।










