অমল মাজি
রাজ্যে অসামাজিক কার্যকলাপ, দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে বড় পদক্ষেপ করতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আগামী সোমবার বিধানসভায় আলোচনা হতে চলেছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল, ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও অসামাজিক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬’ এবং ‘পশ্চিমবঙ্গ জনশৃঙ্খলা রক্ষা (সংশোধনী) বিল, ২০২৬’। বিল দুটি আইনে পরিণত হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের হাতে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা আসবে, পাশাপাশি দাঙ্গা বা ভাঙচুরে সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতির দায়ও বহন করতে হবে অভিযুক্তদের।
নতুন জননিরাপত্তা বিলে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’-এর সংজ্ঞা অনেকটাই বিস্তৃত করা হয়েছে। জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা, সরকারি বা ব্যক্তিগত জমি দখল, সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতি, অবৈধ খনি, বালি বা বনজ সম্পদ লুট, অস্ত্র, মাদক ও বিস্ফোরকের কারবার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, সবই এই আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, রাজ্য সরকার বা অনুমোদিত আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে কোনও ব্যক্তিকে প্রতিরোধমূলকভাবে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত আটক রাখার বিধান রাখা হয়েছে। যদিও সরকার জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত উপদেষ্টা পর্ষদের মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।
এছাড়া জেলা শাসক বা পুলিশ কমিশনার প্রয়োজনে কোনও সমাজবিরোধী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই এলাকায় প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারবেন।
অন্যদিকে, ‘পশ্চিমবঙ্গ জনশৃঙ্খলা রক্ষা (সংশোধনী) বিল, ২০২৬’-এ দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য ‘ক্লেমস কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এই কমিশন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে দোষীদের কাছ থেকে সেই অর্থ আদায়ের নির্দেশ দিতে পারবে।
শুধু সরকারি সংস্থাই নয়, কোনও ব্যক্তি, ব্যবসায়ী বা বৈধ দখলদারও কমিশনের কাছে ক্ষতিপূরণের আবেদন করতে পারবেন। তদন্তের জন্য কমিশন বিশেষজ্ঞ বা সরকারি আধিকারিকদের সাহায্য নিতে পারবে। প্রয়োজনে অভিযুক্তের স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি অ্যাটাচ করার ক্ষমতাও কমিশনের থাকবে। ক্ষতিপূরণ না দিলে তা ভূমি রাজস্ব বকেয়ার মতো আইনগতভাবে আদায় করা হবে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতেই এই আইন আনা হচ্ছে। সরকারের দাবি, এর ফলে একদিকে যেমন সমাজবিরোধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে পারবেন।
তবে বিরোধী মহলের একাংশ ইতিমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, প্রতিরোধমূলক আটক ও এলাকা থেকে বহিষ্কারের মতো ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে। যদিও সরকারের বক্তব্য, আইনি প্রক্রিয়া ও উপদেষ্টা পর্ষদের নজরদারির কারণেই এই ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে।
এখন নজর সোমবারের বিধানসভা অধিবেশনের দিকে। বিল দুটি পাস হলে পশ্চিমবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জন ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির সুরক্ষায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।









