Home / খবর / জেলায় জেলায় / বড় শিল্পের সঙ্গে স্মল ইন্ডাস্ট্রির হাত ধরেই ফিরতে পারে দুর্গাপুরের হারানো শিল্পগৌরব

বড় শিল্পের সঙ্গে স্মল ইন্ডাস্ট্রির হাত ধরেই ফিরতে পারে দুর্গাপুরের হারানো শিল্পগৌরব

অমল মাজি, দুর্গাপুর: একসময় দেশের অন্যতম পরিকল্পিত শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত ছিল দুর্গাপুর। বড় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থাগুলির পাশাপাশি এই শিল্পনগরীর প্রকৃত শক্তি ছিল শত শত স্মল ও মিডিয়াম অনুসারী শিল্প। দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট, অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্ট, এমএএমসি, ডিপিএল-সহ বিভিন্ন বৃহৎ শিল্পের যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ সামগ্রী ও পরিষেবা সরবরাহ করত আরআইপি (RIP) ও আরআইসি (RIC) প্লটের অসংখ্য ছোট শিল্প ইউনিট। সেই শিল্পাঞ্চলের বড় অংশ আজ বন্ধ, রুগ্ন অথবা পরিত্যক্ত। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নতুন শিল্প গড়ার জন্য নতুন জমি খোঁজার আগে, কেনও এই শিল্পভূমিকে কাজে লাগানো হবে না?
শিল্প মহলের মতে, দুর্গাপুরে নতুন শিল্পায়নের সবচেয়ে বড় সুযোগ লুকিয়ে রয়েছে এই বন্ধ শিল্পগুলিতেই। কারণ এখানে ইতিমধ্যেই রাস্তা, বিদ্যুৎ, জল, ড্রেনেজ, শিল্প শেডসহ প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি রয়েছে। নতুন করে জমি অধিগ্রহণ বা দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে, এই পরিত্যক্ত ইউনিটগুলিকে সংস্কার করে নতুন উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দিলে তুলনামূলক কম সময়ে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বড় কারখানা যত কর্মসংস্থান তৈরি করে, তার চেয়েও অনেক বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় তার চারপাশে গড়ে ওঠা অনুসারী শিল্পে। যন্ত্রাংশ উৎপাদন, ফ্যাব্রিকেশন, ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জাম, অটোমোবাইল কম্পোনেন্ট, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্লাস্টিক, রাসায়নিক শিল্প, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট, এসব ক্ষেত্রেই আরআইপি ও আরআইসি প্লটকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব বলে মত শিল্প বিশেষজ্ঞদের।
দুর্গাপুরের শিল্প অর্থনীতির ইতিহাস বলছে, একসময় এই অনুসারী শিল্পগুলিই হাজার হাজার দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার প্রধান ভিত্তি ছিল। বড় শিল্পের উৎপাদন যত বাড়ত, ততই বাড়ত ছোট শিল্পের কাজ। কিন্তু বড় শিল্পে উৎপাদন কমে যাওয়া, আর্থিক সংকট, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং নীতিগত নানা সমস্যার জেরে একে একে বন্ধ হয়ে যায় বহু ইউনিট। আজ সেই কারখানাগুলির অধিকাংশই আগাছায় ঢাকা, অথচ তাদের পরিকাঠামো এখনও অনেকাংশে ব্যবহারযোগ্য।
স্থানীয়দের বক্তব্য, দুর্গাপুর থেকে প্রতিবছর বহু শিক্ষিত যুবক কাজের অভাবে কলকাতা, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ কিংবা দেশের বাইরে পাড়ি দিচ্ছেন। অন্যদিকে শহরের বুকেই শত শত একর শিল্পভূমি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই শিল্পভূমিকে পুনর্ব্যবহার করা গেলে স্থানীয় যুবকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে নতুন শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্বে ব্যবহৃত শিল্পভূমিকে পুনরায় শিল্পের কাজে ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়ছে। এতে খরচ কমে, সময় বাঁচে এবং দ্রুত উৎপাদন শুরু করা যায়। দুর্গাপুরের আরআইপি ও আরআইসি প্লটও সেই মডেলে পুনর্গঠনের উপযুক্ত এলাকা হতে পারে।
শিল্পমহলের একাংশের দাবি, প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে বন্ধ শিল্প ইউনিটগুলির তালিকা তৈরি করা, আইনি জটিলতা দূর করা এবং স্বচ্ছ নীতির মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছে এই জমি ও শিল্প শেড বরাদ্দ করা। একই সঙ্গে স্থানীয় যুবকদের দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য সহজ ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে দুর্গাপুরে নতুন শিল্প বিপ্লবের পথ তৈরি হতে পারে।
দুর্গাপুরের মানুষের আশা, শিল্পায়নের নতুন অধ্যায় শুরু হোক বন্ধ কারখানার ধ্বংসাবশেষ থেকেই। কারণ নতুন জমি খোঁজার আগে, শহরের বুকেই পড়ে থাকা শিল্প সম্পদকে কাজে লাগানোই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। যদি সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে, তবে আরআইপি ও আরআইসি প্লটের নীরব কারখানাগুলিই আবার একদিন যন্ত্রের শব্দে মুখর হয়ে উঠতে পারে, আর সেই সঙ্গে ফিরতে পারে দুর্গাপুরের হারানো শিল্পগৌরব।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *