Home / খবর / জেলায় জেলায় / বন্ধ কারখানার হাজার হাজার একর শিল্পভূমিতে হোক নতুন শিল্প, শিল্পায়নের নতুন রোডম্যাপ চায় শিল্পনগরীর মানুষ

বন্ধ কারখানার হাজার হাজার একর শিল্পভূমিতে হোক নতুন শিল্প, শিল্পায়নের নতুন রোডম্যাপ চায় শিল্পনগরীর মানুষ

অমল মাজি, দুর্গাপুর

একসময় দেশের অন্যতম গর্বের শিল্পনগরী ছিল দুর্গাপুর। ইস্পাত, যন্ত্র নির্মাণ, রাসায়নিক, সার শিল্প, একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল এই শহর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের চাকা থেমেছে। বন্ধ হয়েছে বহু কারখানা, হারিয়ে গেছে হাজার হাজার কর্মসংস্থান। আজ সেই সব কারখানার বিশাল জমি নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে শিল্পের পতনের ইতিহাসের।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে জোরালো হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি, বন্ধ ও রুগ্ন শিল্প কারখানার অব্যবহৃত জমিতে নতুন শিল্প গড়ে তোলা হোক। শিল্প বিশেষজ্ঞ থেকে সাধারণ মানুষ, প্রায় সকলেরই মত, এটাই হতে পারে দুর্গাপুরের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
দুর্গাপুরে একসময় কর্মচঞ্চল এমএএমসি, হিন্দুস্তান ফার্টিলাইজার কর্পোরেশন, বিওজিএল, জেসপ, দুর্গাপুর কেমিক্যালস-সহ একাধিক বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হাজার হাজার একর মূল্যবান শিল্পভূমি বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোথাও ভেঙে পড়ছে কারখানার ভবন, কোথাও জঙ্গল, কোথাও আবার জমি দখলের অভিযোগ। অথচ এই জমিগুলির অধিকাংশেই রয়েছে রাস্তা, বিদ্যুৎ, জল, রেল সংযোগ, ড্রেনেজ-সহ শিল্প স্থাপনের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো। ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের তুলনায় এখানে শিল্প স্থাপন অনেক কম সময় ও কম খরচে সম্ভব।
বর্তমানে শিল্পের ধরন বদলেছে। ভারী শিল্পের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ইলেকট্রিক ভেহিকল, লিথিয়াম ব্যাটারি, সোলার প্যানেল, সেমিকন্ডাক্টর সহায়ক শিল্প, ডিফেন্স ম্যানুফ্যাকচারিং, রেল ও মেট্রোর যন্ত্রাংশ, ডেটা সেন্টার, ওয়্যারহাউসিং এবং লজিস্টিক হাবের চাহিদা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গাপুরের ভৌগোলিক অবস্থান এই ধরনের শিল্পের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত। পাশে অন্ডাল বিমানবন্দর, জাতীয় সড়ক, পূর্ব রেল, ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডরের সম্ভাবনা এবং পূর্ব ভারতের বৃহৎ বাজার, সব মিলিয়ে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন শিল্প গড়ে উঠলে শুধু উৎপাদনই বাড়বে না, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, পরিবহণ, হোটেল, নির্মাণ, পরিষেবা ক্ষেত্রেও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দীর্ঘদিন ধরে কাজের অভাবে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়া বহু যুবকেরও ঘরে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্থানীয়দের প্রশ্নও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ, যখন নতুন শিল্পের জন্য কৃষিজমি বা অন্য কোনও জমির খোঁজার আলোচনা হয়, তখন বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা শিল্পভূমি কেন কাজে লাগানো হবে না? শিল্পের জন্য নির্ধারিত জমিতে শিল্পই হোক, এই দাবিই এখন জোরালো হচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
শিল্প মহলের মতে, রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার যৌথভাবে অবিলম্বে দুর্গাপুরের সমস্ত বন্ধ শিল্প কারখানার জমির একটি সমন্বিত সমীক্ষা (Industrial Land Audit) করুক। কোন জমির আইনি জটিলতা রয়েছে, কোন জমি দ্রুত বিনিয়োগের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হোক। পাশাপাশি বিশেষ কর ছাড়, দ্রুত অনুমোদন এবং আধুনিক পরিকাঠামোর সুবিধা দিয়ে এই এলাকাগুলিকে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিভাইভাল জোন’ হিসেবে গড়ে তোলারও দাবি উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন শিল্প মানেই শুধু কারখানা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত থাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, পরিবহণ, ব্যবসা এবং সামগ্রিক নগর অর্থনীতির বিকাশ। অর্থাৎ বন্ধ শিল্পভূমির পুনর্ব্যবহার হলে দুর্গাপুরের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে।
আজ মরচে ধরা গেট, ভাঙা চিমনি আর আগাছায় ঢাকা কারখানা চত্বর যেন এক হারানো গৌরবের প্রতীক। কিন্তু পরিকল্পিত উদ্যোগ, সঠিক নীতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই পরিত্যক্ত শিল্পভূমিই আবার হয়ে উঠতে পারে নতুন শিল্প বিপ্লবের সূতিকাগার।
দুর্গাপুরের মানুষ এখন অপেক্ষায়, অতীতের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে নয়, বন্ধ কারখানার জমিতেই গড়ে উঠুক আগামী দিনের শিল্প, সৃষ্টি হোক হাজার হাজার কর্মসংস্থান, আর ফিরে আসুক দেশের অন্যতম শিল্পনগরী দুর্গাপুরের হারিয়ে যাওয়া গৌরব।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *