(১) শ্রীচৈতন্যদেবের দারুবিগ্রহ, নবদ্বীপ। (২) কাঠের পুতুলে চৈতন্য। (৩) বরানগরের শ্রীপাটে মহাপ্রভুর চিত্র

মুকুট তপাদার
‘প্রভু, নিত্য আছ জাগি।
তাই তো, প্রভু, হেথায় এল নেমে,
তোমারি প্রেম ভক্তপ্রাণের প্রেমে,
মূর্তি তোমার যুগল-সম্মিলনে সেথায় পূর্ণ প্রকাশিছে।।’ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সমাজ, সাহিত্য, দারুবিগ্রহ, পুরনো চিত্র, মন্দির, ভাস্কর্য নানা ঐতিহ্যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পরম করুণাময় স্বরূপ উন্মোচন হয়েছে। তাঁর অন্তর্ধানের পর বাংলার সমাজ সংস্কৃতি আমূল বদলায়, যা চৈতন্য-সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বাংলাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
‘ডাচ বেঙ্গল পেইন্ট’ ছিল বাংলার এক বিশেষ চিত্রশৈলী, যা ইউরোপীয় ও দেশীয় শিল্পধারার মিশ্রণে গড়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক যুগে এই ধরনের চিত্রকলার প্রচলন দেখা যায়। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, পুরাণ, দেবদেবী, গ্রামীণ পরিবেশ সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হতো। তেল রঙের ব্যবহার ছিল চিত্রে। বিদেশি প্রভাব থাকলেও বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছাপ এতে স্পষ্ট থাকতো। চুঁচুড়া ও ফরাসডাঙ্গা থেকে এই ধরনের চিত্র তৈরি হতো। চিত্রগুলো মূলত কাগজ ও কাপড়ের ওপর আঁকা হতো। ডাচ বেঙ্গল পেইন্টিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যে, ছবিতে শিল্পীর নাম এবং ছবিটি আঁকার তারিখ উল্লেখ করা হতো না। ফলে অনেক ছবির প্রকৃত শিল্পীকে আজও শনাক্ত করা কঠিন। যখন বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে শ্রীচৈতন্যদেব গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন সেসময় ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে প্রেম, মানবতা ও সাম্যের বাণী ছড়িয়ে দেন। তাঁর নামসংকীর্তন মানুষের মধ্যে ধর্মীয় উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। সেই বৈষ্ণব সংস্কৃতির চিত্র উঠে এসেছে ডাচ বেঙ্গল পেইন্টিংয়ে। চৈতন্য মহাপ্রভুর নামসংকীর্তন চিত্রে দেখা যায়। তাই এই শিল্পধারা বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

ডাচ বেঙ্গল পেইন্টিংয়ে সংকীর্তন
চৈতন্য কৃষ্ণ অবতারের প্রভাব আজও বাংলার জনজীবনে গভীরভাবে জড়িয়ে। কাটোয়ার গঙ্গায় ডুব দিয়ে নিমাই যে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন, সেই স্মৃতি এখনও আপামর ভক্তগণকে ভক্তি যোগে নিমগ্ন রেখেছে। কাটোয়ায় ১৫১০ সালে তিনি পণ্ডিত কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাস নেন। নাম হয় ‘শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’। সঙ্গে অন্তরঙ্গ পাঁচ সাধক সাক্ষী থাকেন এই সন্ন্যাস মন্ত্র গ্রহণের। স্বরূপ দামোদর, গদাধর পন্ডিতরা নিয়েছিলেন একইসঙ্গে সন্ন্যাস। লেখক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, কাটোয়ার মেলায় ঘরে তৈরি ছানার সন্দেশ বিক্রি হয়। সন্দেশগুলোর নামও অভিনব, কোনটি ‘অদ্বৈত’, আবার অন্যটি ‘নিতাই’, ‘হরিদাস’, আর ‘নদেরচাঁদ’। মনে হয়, এশুধু মিষ্টি নয়, বৈষ্ণব ভাবধারাও যেন মানুষের হাতে হাতে প্রচারিত হচ্ছে। চৈতন্যদেব প্রেম, ভক্তি ও মানবতার যে বাণী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা বাংলার মিষ্টির মধ্যেও গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। আজও তাঁর স্মৃতি মানুষের বিশ্বাসে যেন জীবন্ত।
‘সভার করিব গৌরসুন্দর উদ্ধার।
ব্যতিরিক্ত বৈষ্ণবনিন্দক দুরাচার।।’ – বৃন্দাবন দাস ঠাকুর
চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের পর বাংলার সমাজে এক নতুন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জাগরণ দেখা গিয়েছিল। তাঁর প্রেমভক্তির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার বিভিন্ন স্থানে চৈতন্য মন্দির নির্মাণ শুরু হয় ভক্তদের উদ্যোগে। কাটোয়ার বিখ্যাত শ্রী শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু মন্দির, এখানে পণ্ডিত কেশব ভারতী থাকতেন। স্থানীয়রা এই মন্দির কে বলেন ‘গৌর বাড়ি’। চৈতন্যদেবের এক দারুমূর্তি সেখানে পূজিত হয়। গুপ্তিপাড়ার জোড়বাংলা চৈতন্য মন্দির বহু পুরনো। বাংলার চালা ঘরের মতো পাশাপাশি দুইটি ঘর জুড়ে জোড়বাংলা গঠনশৈলীর মন্দির হয়। শ্রীপাট অম্বিকা কালনার শ্রী শ্রী মহাপ্রভু মন্দিরে গৌর-নিতাই দারুমূর্তিটি কথিত যে, চৈতন্য মহাপ্রভুর সময়কার। এখানে বিগ্রহটির ঝলক দর্শন হয়। কালনায় এই গৌরীদাস পণ্ডিতের শ্রীপাট চৈতন্যদেবের স্মৃতিধন্য। চাতরা শ্রীরামপুরের শ্রীগৌরাঙ্গ মন্দিরটি বহু পুরনো। শ্রীচৈতন্যের পার্ষদ কাশীশ্বর পণ্ডিত মন্দির ও মহাপ্রভুর দারুমূর্তি নির্মাণ করে পুজো করতেন। এই মন্দিরে শ্রীচৈতন্যদেব স্বয়ং এসেছিলেন। নিজের মূর্তি দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে সরিয়ে দিতে আদেশ দেন। পরবর্তীতে কাশীশ্বর পন্ডিতের পরিবার পুনরায় বিগ্রহ স্থাপন করেন। খড়দহের শ্রীশ্রী রাধাশ্যামসুন্দর বিগ্রহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু ইতিহাস। নিত্যানন্দ মহাপ্রভু খড়দহে বাস করতেন।
‘শ্রীচৈতন্য সেই কৃষ্ণ, নিত্যানন্দ রাম
নিত্যানন্দ পূর্ণ করে চৈতন্যের কাম। দুই ভাই একতত্ব – সমান প্রকাশ..’।
নিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্র গোস্বামী এখানে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মন্দিরগুলোয় গৌর-নিতাই দারুমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। উত্তর ২৪ পরগণার খড়দহে ও হুগলি জেলার সপ্তগ্রামে নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর জন্যে বৈষ্ণব ভক্তির আবহ মানুষের মধ্যে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। খড়দহে রয়েছে একটি নবরত্ন বিশিষ্ট শ্রী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর মন্দির। নয়টি চূড়া নিয়ে এই ধরনের স্থাপত্য তৈরি হয়।
বাংলার লোকশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন কাঠের পুতুলে শ্রীচৈতন্যদেব। শিমুল ও আম কাঠের মতো উপকরণ দিয়ে শিল্পীরা শ্রীচৈতন্যের মূর্তি গড়ে তোলেন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভক্তির আবেগ। গ্রামবাংলার শিল্পীরা বংশপরম্পরায় এই শিল্পচর্চা করে চলেছেন। তাঁদের জীবিকা অনেকটাই নির্ভর করে এই কাঠের পুতুল তৈরির উপর। আর্থিক অভাব ও আধুনিকতার চাপে এই শিল্প আজ সংকটের মুখে পড়লেও শিল্পীরা অসীম ধৈর্য দিয়ে কষ্ট করে একে বাঁচিয়ে রেখেছেন, যা সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের আদর্শ নিঃশর্ত কৃষ্ণ প্রেম। নবদ্বীপে শচী দেবীর নিমাই এখানে কীর্তনের ধ্বনিতে আর বৈষ্ণব ভক্তির আবহে মানুষের হৃদয়ে সাম্য, প্রেম ও মানবতার বাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন। বহু ইতিহাসের সাক্ষী নিয়ে রয়েছে নবদ্বীপে ‘ধামেশ্বর’ মহাপ্রভুর মন্দির। বিষ্ণুপ্রিয়াদেবী সেবিত এই মূর্তি। চৈতন্যদেবের জীবিতকালে মূর্তিটি নির্মাণ হয়। নবদ্বীপে শ্রীবাস ঠাকুরের অঙ্গনটিকে বলা হয় শ্রীবাস অঙ্গন। অঙ্গনটি ছিল চৈতন্যদেবের সবচেয়ে প্রিয় স্থল। এখানে তাঁর বহু লীলা সংকীর্তন ভক্তি মাহাত্ম্য মিশে রয়েছে। এই স্থানে চৈতন্যদেবের বিশ্বরূপ বা মহাপ্রকাশের বিগ্রহ দেখা যায়, যা বঙ্গে বিরল। শ্রীবাস ঠাকুরকে তিনি বিশ্বরূপ দর্শন করিয়েছিলেন। এভাবেই আজও বাংলার বহু পুরনো মন্দিরে তাঁর প্রভাব সচল।

গুপ্তিপাড়ার জোড়বাংলা চৈতন্য মন্দির। খড়দহের নয়টি রত্ন মহাপ্রভুর মন্দির
গৌড়সুন্দর নীলাচলে ও সেখানকার রথযাত্রাকে আমজনতার মধ্যে এনে সব ভেদাভেদ হঠিয়ে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন মানবপ্রেম। চব্বিশ বছর নীলাচল থেকে দক্ষিণ ভারত আবার কখনো ব্রজধাম ছুটে গিয়েছেন। ভাবউন্মাদ বেশে নীলাচল থেকে আসতেন বৃন্দাবন। রাধাকুণ্ড, শ্যামাকুণ্ড, যমুনা তীরে চিরাঘাট, অক্রূর ঘাট কত লুপ্ত তীর্থ বের করলেন। শ্রীচৈতন্যের যাত্রার পর বহু মন্দির বৃন্দাবনে নির্মাণ হয়। একবার বৃন্দাবন ধাম থেকে শ্রীনিবাস আচার্য সেখানকার গোস্বামীদের অমূল্য শাস্ত্রগ্রন্থ নিয়ে বাংলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দুর্গম অরণ্যপথ পেরিয়ে বাংলার বিষ্ণুপুরের নিকটবর্তী গোপালপুর গ্রামে পৌঁছায়, তখন একদল দস্যু ধনরত্ন ভেবে সেই বৈষ্ণব পুঁথিগুলি লুঠ করে নিয়ে যায়। পরে বিষ্ণুপুরের রাজা প্রকৃত ঘটনা জানতে পেরে গভীর অনুতপ্ত হন। সমস্ত পুঁথি যথাযোগ্য সম্মানের সঙ্গে শ্রীনিবাস আচার্যের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় প্রভাবিত হয়ে বিষ্ণুপুরের রাজারা তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন। পরবর্তীকালে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিষ্ণুপুরে নির্মিত হয় চালা, রত্ন, দেউল রীতির অপূর্ব সব মন্দির, যা আজও বাংলার ঐতিহ্য ও বৈষ্ণব সংস্কৃতির গৌরব বহন করছে। সমবেত হরিনাম ও খোল-করতালের আওয়াজে গ্রাম বাংলার সংস্কৃতি জানান দেয় চৈতন্য আন্দোলন বাঙালিকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছিল।









