Home / প্রবন্ধ / রোববারের লেখা / নির্বাণের পথে করুণার প্রথম দীপশিখা

নির্বাণের পথে করুণার প্রথম দীপশিখা

মুকুট তপাদার

সময়ের সাথে হারিয়ে যাওয়া এযেন এক বিস্মৃত সুর। সারনাথের প্রাচীন নাম ছিল ‘সারঙ্গনাথ’। জাতকের গল্পে আছে, সারঙ্গ অর্থ হরিণ, আর নাথ অর্থ প্রভু। এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে এক মায়াবী উপাখ্যান।

এখানেই অরণ্যে ঘেরা স্থানে বিচরণ করতো এক হরিণ। বলা হয়, গৌতম বুদ্ধ পূর্বজন্মে হরিণ রূপে জন্মেছিলেন। হরিণটি নিজের প্রাণের বিনিময়ে রক্ষা করেছিল অন্যান্য হরিণদের। সবুজ ঘাসে মোড়া মৃগদাবে এই শান্ত প্রকৃতির কোলে বাস করত অসংখ্য হরিণের দল।

ঐতিহাসিক গ্রন্থ দীপবংশ অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধ কুশীনগরে দেহত্যাগের প্রায় ২১৮ বছর পর সম্রাট অশোক সিংহাসন আরোহণ করেছিলেন। বুদ্ধ বোধিলাভের পর বারাণসীর কাছে সারনাথে ধর্মচক্র প্রবর্তন করেন। জগতে মুক্তির আটটি পথ তিনি তাঁর পাঁচ শিষ্যকে দান করে যান। কৌণ্ডিন্য, বাপ্পা, ভদ্রিকা, মহানাম ও অশ্বজিৎ যাদের পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষু বলা হয়। এনাদের মাধ্যমে বিশ্বে ধর্মোপদেশ প্রচার হয়েছিল। এই স্থানেই সম্রাট অশোক ধামেক স্তূপ নির্মাণ করে দেন। যা সারনাথের সবথেকে বড় সুরক্ষিত স্তুপ। গুপ্ত যুগে ইঁটের নির্মিত স্তূপটি সংস্কার সাধন হয়েছিল।

ধামেক স্তূপের উত্তরে রয়েছে ইঁটের নির্মিত ধর্মরাজিকা স্তূপ। এটিও নির্মাণ করেছিলেন সম্রাট অশোক। ১৭৯৪ সালে বারাণসীর স্থানীয় এক জমিদার স্তূপটি ভেঙে ফেলেন। একটি বাজার নির্মাণের জন্য বৌদ্ধস্তূপের ইঁট ব্যবহার করেন। এই স্তূপের কাছেই ছিল বৌদ্ধভিক্ষুদের বাস।

স্বামীজি বলতেন, ‘আমি সারা জীবন বুদ্ধের অত্যন্ত অনুরাগী… আহা সেই সাহসিকতা, সেই নির্ভীকতা, সেই গভীর প্রেম! মানুষের কল্যাণের জন্যই তাঁর জন্ম! সবাই নিজের জন্য ঈশ্বরকে খুঁজছে, কতলোকই সত্যানুসন্ধান করছে; তিনি কিন্তু নিজের জন্য সত্যলাভের চেষ্টা করেননি। তিনি সত্যের অনুসন্ধান করেছেন মানুষের দুঃখে কাতর হয়ে। কেমন করে মানুষকে সাহায্য করবেন, এই ছিল তাঁর একমাত্র চিন্তা।’

সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের পর শিলালিপিতে লিখে গিয়েছিলেন, ‘অতঃপর আমার বংশধরগণের মধ্যে কেউ যেন অন্য কোনো জাতিকে যুদ্ধে জয় করে যশোলাভের প্রয়াসী না হয়। যদি তারা যশস্বী হতে চায়, তবে অন্য জাতিকে সাহায্য করে যেন তারা যশ অর্জন করে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের যাঁরা শিক্ষক ও আচার্য – বিভিন্ন দেশে যেন তাদের প্রেরণ করা হয়। তরবারির সহায়তায় যে যশ অর্জিত হয়, সেটা যশই নয়।’

এরপর অশোক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মপ্রচারককে প্রেরণ করেছেন। বৌদ্ধধর্ম ধীরে ধীরে রাজনীতি ক্ষেত্রেও প্রভাব ও ক্ষমতা বিস্তার করেছিল। সারনাথ থেকে পাওয়া যায় সম্রাট অশোকের অন্যতম কীর্তি ‘অশোক স্তম্ভ’। যা ভারতের জাতীয় প্রতীক। যার শীর্ষে চারটি সিংহ আছে। ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতীক। এর নিচে আছে এক ধর্মচক্র, একটি ষাঁড় ও একটি ঘোড়া৷

সারনাথের জাদুঘরে বেলেপাথরের একটি বুদ্ধমূর্তি আছে, সেটিও পাওয়া যায় এই বৌদ্ধ তীর্থ থেকে। এই স্থান কেবল ভ্রমণ স্থল নয়, বরং প্রতিটি পাথর, দেয়াল ও স্তম্ভে অতীতের নানা কাহিনী ও শিল্প যেন ইতিহাসের এক বিস্ময়।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *