অমল মাজি, দুর্গাপুর:
দুর্গাপুরে মুখোমুখি দুই বন্ধু, জমছে নির্বাচনী লড়াই।
দুর্গাপুরের রাজনীতিতে এবার এক অনন্য সমীকরণ তৈরি হয়েছে—বহু দিনের ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব রূপ নিচ্ছে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টি-র সংঘর্ষে দুর্গাপুর (পশ্চিম) এলাকায় রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে।
বন্ধুত্ব বনাম বন্ধুত্ব ভোটযুদ্ধ
দুর্গাপুর পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রে এবার সবচেয়ে আলোচিত লড়াই। এখানে তৃণমূল কংগ্রেস নতুন মুখ হিসেবে ব্যবসায়ী কবি দত্তকে প্রার্থী করেছে। তাঁর প্রতিপক্ষ, বর্তমান বিজেপি বিধায়ক লক্ষ্মণ চন্দ্র ঘোরুই—যিনি শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নন, বরং কবি দত্তর বহু দিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সামাজিক ও ব্যক্তিগত পরিসরে তাঁদের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। সিটি সেন্টারের আড্ডা থেকে পারিবারিক অনুষ্ঠানে—দু’জনকে বহুবার একসঙ্গে দেখা গিয়েছে। কিন্তু সেই সম্পর্কই এখন রাজনৈতিক বাস্তবতায় একেবারে ভিন্ন রূপ নিচ্ছে।
কবি দত্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন,
“বন্ধুত্ব তার জায়গায় থাকবে, কিন্তু ভোটের ময়দানে আমি এক ইঞ্চি জমিও ছাড়ব না। এখন আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী, এবং সেই ভাবেই লড়াই হবে।”
বিজেপির অন্দরেও কৌশলগত হিসাব
অন্যদিকে, বিজেপির অন্দরেও এই প্রার্থী নির্বাচন ঘিরে কিছু কৌশলগত আলোচনা সামনে এসেছে। দলীয় সূত্রে ইঙ্গিত, লক্ষ্মণ ঘোরুই আগেভাগেই আন্দাজ করেছিলেন যে কবি দত্তকে প্রার্থী করা হতে পারে। সেই কারণেই তিনি দুর্গাপুর পূর্ব বিধানসভা কেন্দ্রে লড়াই করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
তবে বিজেপি নেতৃত্ব সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। আসলে লক্ষণ ঘোরুই এর গতিবিধি, কীর্তি কলাপ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল বিজেপি নেতৃত্ব, তাই লক্ষণ ঘোরুইকেই তাঁর পুরনো কেন্দ্রেই রেখে দেয়। ফলে, পুরনো বন্ধুর বিরুদ্ধে লড়াই এড়ানোর সুযোগ আর হয়নি।
নবাগত বনাম অভিজ্ঞ: লড়াই কতটা কঠিন?
রাজনীতিতে নবাগত কবি দত্তের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—একজন অভিজ্ঞ বিজেপি বিধায়কের বিরুদ্ধে লড়াই। অন্যদিকে, লক্ষ্মণ ঘোরুইয়ের জন্যও এই লড়াই সহজ নয়, কারণ প্রতিপক্ষ শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নন, এলাকায় পরিচিত মুখ এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই লড়াইয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্থানীয় প্রভাব এবং সংগঠন—তিনটিই বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে।
মানুষের চোখে ‘বন্ধুত্বের লড়াই’
দুর্গাপুরের সাধারণ মানুষের কাছে এই নির্বাচন শুধুই রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং এক আবেগঘন গল্প। চায়ের দোকান থেকে বাজার—সব জায়গাতেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, “বন্ধু বনাম বন্ধু”।
এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়,
“আমরা দু’জনকেই একসঙ্গে দেখেছি। এখন ভোটে একে অপরের বিরুদ্ধে—এটা দেখতে সত্যিই অদ্ভুত লাগছে।
আগামী দিনের সমীকরণ
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই লড়াই শুধু একটি আসনের ফল নির্ধারণ করবে না, বরং দুর্গাপুর অঞ্চলের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর রাজনীতির প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তার এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠছে এই নির্বাচন।
বন্ধুত্ব টিকবে, না কি রাজনীতির উত্তাপে তা আরও দূরে সরে যাবে—এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোটা দুর্গাপুর।
অন্যদিকে তৃণমূল দলের অন্দরে অধিকাংশ নেতা কর্মীরা কবি দত্তকে প্রার্থী হিসাবে মেনে নিতে পারেন নি। কারণ তৃণমূল রাজনীতির ‘র’ জানেন না। দলের কোনও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কবি দত্ত কোনও দিন যুক্ত ছিলেন না, সেই অভিজ্ঞতাও নেই তাঁর।
তৃণমূলের নেতা কর্মীরা চেয়েছিলেন বর্ষীয়ান নেতা অপুর্ব মুখার্জিকে প্রার্থী করা হোক। সেক্ষেত্রে তৃণমূলের জয়টা নিশ্চিত হতো।









