Home / খবর / জেলায় জেলায় / দুর্গাপুর পশ্চিমে বিজেপির অন্দরে অসন্তোষ! লক্ষণ ঘোড়ুইকে ঘিরে অভিযোগ, ২০২৬ ভোটের আগে প্রার্থী বদলের জল্পনা, প্রার্থী করা হতে পারে চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়কে

দুর্গাপুর পশ্চিমে বিজেপির অন্দরে অসন্তোষ! লক্ষণ ঘোড়ুইকে ঘিরে অভিযোগ, ২০২৬ ভোটের আগে প্রার্থী বদলের জল্পনা, প্রার্থী করা হতে পারে চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়কে

অমল মাজি, দুর্গাপুর: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরের রাজনৈতিক সমীকরণ নতুন করে আলোচনায় আসছে। বিশেষ করে লক্ষণ ঘোড়ুই-কে ঘিরে বিজেপির অন্দরে বাড়তে থাকা অসন্তোষ এখন দুর্গাপুর পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে।

দলীয় একাংশের অভিযোগ, বর্তমান বিজেপি বিধায়কের বিরুদ্ধে নানা বিতর্ক এবং সংগঠনের ভিতরে ক্ষোভ তৈরি হওয়ায় আগামী নির্বাচনে তাকে প্রার্থী করা হবে কি না, তা নিয়ে দলের ভিতরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, শিল্পাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিজেপি যদি আবার জিততে চায়, তাহলে দলীয় ঐক্য এবং শক্ত সংগঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সেই ঐক্যে ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে দলের অন্দর মহলের দাবি, জেলার সহ সভাপতি চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রার্থী করা হোক।

২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে লক্ষণ ঘোড়ুই বিজেপির প্রার্থী হিসেবে এই আসনে লড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের বিশ্বনাথ পাড়িয়াল-কে পরাজিত করেন। বিশেষ করে সেইসময় সিপিএমের বিপুল সংখ্যক ভোট বিজেপির ঝুলিতে পড়ে। তারফলেই বিজেপির এই জয় আসে।

২০২১ সালের ফলাফল (দুর্গাপুর পশ্চিম):
লক্ষণ ঘোরুই (বিজেপি) – প্রায় ৮৩,০০০ ভোট পান।
বিশ্বনাথ পারিয়াল (তৃণমূল) – প্রায় ৬৮,০০০ ভোট।
জয়ের ব্যবধান – প্রায় ১৪,৬০০ ভোট।
এই জয়ের মাধ্যমে দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে বিজেপি বড় রাজনৈতিক সাফল্য পায়।
এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চল মূলত সিপিএমের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল।

কিন্তু ২০১৬ বনাম ২০২১: ভোটের সমীকরণ কীভাবে বদলাল?

দুর্গাপুর পশ্চিম আসনে রাজনৈতিক সমীকরণ গত এক দশকে দ্রুত বদলেছে।

২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন:
জয়ী – বিশ্বনাথ পাড়িয়াল (কংগ্রেস ও সিপিএম জোট প্রার্থী)।
তৃণমূল দ্বিতীয় এবং
বিজেপি তখন তৃতীয় শক্তি।

আর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হন লক্ষণ ঘোরুই । রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই দুর্গাপুর–আসানসোল শিল্পাঞ্চলে বিজেপির ভোট দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে সিপিএমের বিপুল ভোট সুইং করে বিজেপিতে, তারই প্রভাব ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে দেখা যায়।

বিজেপির অন্দরে এখন কেন বাড়ছে অসন্তোষ?
দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, কয়েকটি কারণে বিজেপির অন্দরে অসন্তোষ বাড়ছে। পাশাপাশি বিজেপির নেতা কর্মীরা বিধায়কের পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
তাদের অভিযোগ, গত পাঁচ বছরে বিধায়ক নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিলেন।

পাশাপাশি, ১. সংগঠন নিয়ে ক্ষোভ। স্থানীয় কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, বিধায়ক হওয়ার পর থেকে সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ কমেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় কর্মীদের মতামত গুরুত্ব পায়নি।

২. দলীয় কোন্দল প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি বিজেপিরই এক জেলা নেতা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বিধায়কের বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। এমনকি তিনি ইঙ্গিত দেন যে, এবার লক্ষণ ঘোরুইকে প্রার্থী করা হলে তিনি নির্দল হিসেবেও লড়তে পারেন। এই ঘটনায় বিজেপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে এসেছে।

৩. বিতর্ক ও রাজনৈতিক চাপ। বিভিন্ন সময়ে বিধায়ককে ঘিরে স্থানীয় স্তরে প্রতিবাদ এবং বিতর্কও সামনে এসেছে, যা বিরোধী দলগুলি রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করছে।

২০২৬ ভোটের আগে বিজেপির সামনে বড় প্রশ্ন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, দুর্গাপুর পশ্চিম আসনটি বিজেপির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্পাঞ্চল আসানসোল–দুর্গাপুর বেল্টে ভোটের ফল অনেক সময় রাজ্যের বড় রাজনৈতিক বার্তা দেয়। তাই বিজেপির সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— বর্তমান বিধায়ক লক্ষণ ঘোরুই-কেই কি আবার প্রার্থী করা হবে? না কি দল নতুন মুখ এনে সংগঠনকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করবে?

দলীয় সূত্রের দাবি, জেলা নেতৃত্বের একাংশ ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য বিকল্প প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।

অন্যদিকে তৃণমূলও দুর্গাপুর পশ্চিম আসন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগঠন শক্ত করার কাজ শুরু করেছে বলে রাজনৈতিক সূত্রের খবর।

তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের মতে, ২০২১ সালে বিজেপি সাময়িকভাবে জিতলেও বিজেপির বিধায়কের জন্য সংগঠনের ভিত্তি এখনও তৃণমূলেরই শক্ত।

দুর্গাপুর পশ্চিম শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্র নয়, এটি দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের অন্যতম রাজনৈতিক কেন্দ্র।
দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের বেশিরভাগ কলকারখানা, শ্রমিক, শিল্পকর্মী, ব্যবসায়ী এবং মধ্যবিত্ত ভোটারদের বড় অংশ এই কেন্দ্রে প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,
শিল্পাঞ্চলে অর্থনীতি কর্মসংস্থান, কেন্দ্রীয় বনাম রাজ্য রাজনীতি —এই তিনটি বিষয়ই ভোটের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেয়।

২০২৬ সালের ভোটের এখনও কিছুটা সময় থাকলেও দুর্গাপুর পশ্চিমে রাজনৈতিক লড়াই ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বিজেপির অন্দরের অসন্তোষ এবং প্রার্থী নিয়ে জল্পনা যদি বাড়তে থাকে, তাহলে এই আসনে রাজনৈতিক সমীকরণ নতুন মোড় নিতে পারে। তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ২০২৬ সালের নির্বাচনে দুর্গাপুর পশ্চিমে বিজেপির মুখ কি আবার লক্ষণ ঘোরুই, নাকি নতুন কোনও প্রার্থী?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে শিল্পাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ আসনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক লড়াই।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *