মুকুট তপাদার
সমগ্র ভারতের শক্তি ও মুক্তির প্রতীক ‘ভারতমাতা’। ১৮৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস আনন্দমঠের মধ্য দিয়ে এই ধারণার সার্থক বিকাশ ঘটে। সেখানে ভারতমাতাকে দেবী দুর্গা ও কালীর অবিচ্ছেদ্য রূপ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এই উপন্যাসের প্রাণ ‘বন্দেমাতরম্’ গানটির উৎসস্থল নিয়ে কখনও লালগোলা রাজবাড়ি, চুঁচুড়ার বন্দেমাতরম ভবন কিংবা বঙ্কিমের নিজ বাসভবন নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার কথা উঠে আসে। যা পরে বিখ্যাত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় আনন্দমঠ উপন্যাসে ব্যবহার হয়েছিল।
ভারতমাতা স্বয়ং দেবী দুর্গারই এক রূপ। দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে হলে সর্বাগ্রে এই মাতৃসেবায় নিজেকে সঁপে দিতে হবে। ভারতমাতা, যেন দেবী দুর্গার সত্তা। তাঁর এক হাতে জাতীয় পতাকা ও অন্য হাতে ত্রিশূল। বাহন সিংহ। ভুবনেশ্বরের কেদার গৌরী মন্দিরে গর্ভগৃহের ভেতর চার হাত বিশিষ্ট দেবী গৌরীর শান্ত, সৌম্য ও তপস্বিনী মূর্তিতে যেন ভারত মাতার রূপ ফুটে ওঠে। তিনি কোন নতুন এক দেবী নন, বরং তিনি গৌরী বা দুর্গাই।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বঙ্গমাতা’ নামে ঐতিহাসিক এক চিত্রকর্ম আঁকেন। গেরুয়া বস্ত্র পরিহিতা ও চার হাত বিশিষ্ট দেবীপ্রতিমা আঁকেন। চার হাতে রয়েছে পাণ্ডুলিপি, ধানের শীষ, বস্ত্র ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক জপমালা। পায়ের নিচে সাদা পদ্ম ফুল। যা পরাধীন ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর মূল ছবিটির নাম দিয়েছিলেন ‘বঙ্গমাতা’। পরে এর সার্বজনীন রূপ সমগ্র দেশের প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয়। ভগিনী নিবেদিতা এই ছবির গভীর প্রশংসা করেছিলেন।
১৯৩৬ সালে শিবপ্রসাদ গুপ্ত বারাণসীর ‘কাশী বিদ্যাপীঠ’ চত্বরে তৈরি করেন ঐতিহাসিক ভারত মাতা মন্দির, যা উদ্বোধন করেন মহাত্মা গান্ধী। সেখানে কোনো মূর্তি নেই; মার্বেল পাথরে খোদাই করা অবিভক্ত ভারতের ত্রিমাত্রিক মানচিত্রটিই ভারতমাতা রূপে পূজিত হয়। অধ্যাত্ম রূপ ও স্বদেশ চর্চায় ভারতমাতা যেন দেশের অন্তরাত্মা। বহু গুপ্ত সমিতির বিপ্লবীদের প্রেরণা দিয়েছিল।









