অমল মাজি, দুর্গাপুর: একসময় পূর্ব ভারতের ‘রুর’ নামে পরিচিত দুর্গাপুর ছিল দেশের শিল্পোন্নয়নের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ইস্পাত, ভারী প্রকৌশল, রাসায়নিক শিল্প, যন্ত্র নির্মাণ, সব মিলিয়ে এই শহরই ছিল বাংলার শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সময়ের সঙ্গে একের পর এক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, বহু কারখানা ধুঁকেছে, কর্মসংস্থান কমেছে, আর হাজার হাজার পরিবার পড়েছে অনিশ্চয়তার মুখে।
দীর্ঘদিন ধরে তাই একটাই প্রশ্ন ঘুরে বেড়িয়েছে, দুর্গাপুর কি আবার তার হারানো শিল্পগৌরব ফিরে পাবে?
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছে শিল্পমহল। কারণ দুর্গাপুরকে ঘিরে একের পর এক বড় শিল্প ও পরিকাঠামো প্রকল্পের ঘোষণা নতুন আশার সঞ্চার করেছে। প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ইস্পাত শিল্পে বিনিয়োগ, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা, ইস্ট কোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডরের সঙ্গে সংযুক্তির সম্ভাবনা এবং আসানসোল–দুর্গাপুর মেট্রো প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, সব মিলিয়ে শিল্পাঞ্চলে যেন নতুন করে জেগে উঠেছে স্বপ্ন।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্গাপুরের সবচেয়ে বড় শক্তি তার পরিকাঠামো। জাতীয় সড়ক, উন্নত রেল যোগাযোগ, কাজী নজরুল ইসলাম বিমানবন্দর, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, দক্ষ প্রযুক্তিগত জনশক্তি এবং দীর্ঘ শিল্প ঐতিহ্য, নতুন বিনিয়োগের জন্য এই শহরকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় করে তুলেছে।

আরও বড় বিষয় হল, বন্ধ হয়ে যাওয়া এমএএমসি, বিওজিএল, এইচএফসি-সহ একাধিক শিল্প সংস্থার বিশাল জমি এখনও ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। এই জমিগুলিকে নতুন শিল্পের জন্য কাজে লাগানো গেলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন অনেকটাই কমবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি যেমন বাড়বে, তেমনই ব্যয়ও কমবে।
বুধবার বিধানসভায় দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়গুলিই গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পড়ে থাকা দুর্গাপুর কেমিক্যালসের ১৮৬ জন শ্রমিক এখনও বকেয়া বেতন পাননি। তাই শ্রমিকদের প্রাপ্য নিশ্চিত করে পিপিপি (PPP) মডেলে কারখানাটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি। একইসঙ্গে এমএএমসি, বিওজিএল ও এইচএফসি-সহ বন্ধ শিল্প সংস্থাগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর জোর দেন।
বিধায়ক আরও জানান, বিওজিএলের অব্যবহৃত জমিতে একটি ডিফেন্স হাব গড়ে তোলার প্রস্তাব বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৩ সালের লজিস্টিক নীতির আলোকে দুর্গাপুরে একটি আধুনিক লজিস্টিক হাব গড়ে তোলার দাবিও তিনি বিধানসভায় উত্থাপন করেন। তাঁর বক্তব্য, এই দুই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দুর্গাপুরে বৃহৎ শিল্পের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রেও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এডিডিএ-র (ADDA) অধীনে বহু শিল্পজমি দীর্ঘ ২০-২৫ বছর ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। যেসব শিল্পপতি দীর্ঘদিন জমি ব্যবহার করছেন না, সেসব জমি ফিরিয়ে নিয়ে এমএসএমই, স্টার্ট-আপ ও নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য বরাদ্দ করার দাবি জানান। এছাড়াও হেমশিলা স্কুল এর সামনে একটি বৃহৎ এলাকায় সেমিকন্ডাক্টর হাব গড়ে তোলার সম্ভাবনার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে সম্ভাব্য সেমিকন্ডাক্টর শিল্প। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দুর্গাপুর শুধু ভারী শিল্পের শহর হিসেবেই নয়, উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকেন্দ্র হিসেবেও নতুন পরিচয় পেতে পারে। এতে প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, আইটি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীদের জন্য তৈরি হবে বিপুল কর্মসংস্থান। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, লজিস্টিকস, আবাসন, পরিবহণ ও পরিষেবা ক্ষেত্রেও আসতে পারে বড় পরিবর্তন।
বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় আরও জানান, দুর্গাপুরে ইতিমধ্যেই জেএসডব্লিউ-র নতুন বিনিয়োগ, এবং আগামী ২২ আগস্ট প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার নতুন মেটালিক্স প্রকল্পের উদ্বোধনের মতো একাধিক শিল্প উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। তাঁর দাবি, বর্তমানে দুর্গাপুরে ২০টিরও বেশি নতুন শিল্প প্রকল্পের প্রস্তাব জমা পড়েছে এবং দেশ-বিদেশের বড় বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ দেখিয়েছেন।
তবে শিল্পমহল একইসঙ্গে দ্বিধাগ্রস্থ। অতীতেও দুর্গাপুরে বহু বড় শিল্প প্রকল্পের ঘোষণা হয়েছিল, কিন্তু নানা প্রশাসনিক, আর্থিক ও নীতিগত জটিলতায় তার অনেকটাই বাস্তবায়িত হয়নি। তাই এবার শুধু ঘোষণা নয়, জমি চিহ্নিতকরণ, বিনিয়োগ নিশ্চিতকরণ, দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উৎপাদন চালুর স্পষ্ট রোডম্যাপ দেখতে চাইছেন শিল্পোদ্যোগী ও সাধারণ মানুষ।
বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে শিল্প উন্নয়ন নিয়ে সমন্বয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। সেই সমন্বয় যদি দ্রুত অনুমোদন, উন্নত পরিকাঠামো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর হয়, তাহলে দুর্গাপুরের সামনে খুলে যেতে পারে নতুন সম্ভাবনার দরজা।
সবচেয়ে বড় কথা, দুর্গাপুরের মানুষ এখন আর প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব ফল দেখতে চান। বছরের পর বছর ধরে কর্মসংস্থানের অভাবে বহু যুবক ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন। নতুন শিল্প এলে শুধু বড় কারখানাই নয়, পরিবহণ, নির্মাণ, ব্যবসা, হোটেল, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং পরিষেবা ক্ষেত্রেও তৈরি হবে হাজার হাজার কর্মসংস্থান।
দুর্গাপুর আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে রয়েছে নতুন শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনা। এখন একটাই প্রশ্ন, বিধানসভায় উত্থাপিত এই প্রস্তাব ও ঘোষণাগুলি কত দ্রুত বাস্তবের মাটিতে নামবে, সেটাই এখন দেখার।









