অমল মাজি, দুর্গাপুর: একসময় দেশের শিল্পায়নের প্রতীক ছিল দুর্গাপুর। ইস্পাতের আগুনে গড়ে ওঠা এই শহর বহু দশক ধরে নতুন শিল্প বিপ্লবের অপেক্ষায় ছিল। সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের ইঙ্গিত মিলল রাজ্য বাজেটে। দুর্গাপুরে অত্যাধুনিক সেমি কন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং হাব গড়ে তোলার ঘোষণাকে ঘিরে শিল্পমহল, ব্যবসায়ী মহল, শিক্ষিত যুবসমাজ থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে প্রবল আশাবাদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু দুর্গাপুর নয়, পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে এই শিল্পনগরী।
বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতি ও প্রযুক্তির মূল ভিত্তিই হল সেমি কন্ডাক্টর। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, এটিএম কার্ড, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম থেকে মহাকাশ গবেষণা, সর্বত্র এর ব্যবহার অপরিহার্য।
বিশ্বজুড়ে সেমি কন্ডাক্টরের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দুর্গাপুরে সেমি কন্ডাক্টর উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে উঠলে তা শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, গোটা পূর্ব ভারতের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে।
রাজ্য বাজেটে সেমি কন্ডাক্টর ইউনিটের পাশাপাশি দুর্গাপুরে আধুনিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টার তৈরির কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
এর আগে কেন্দ্রীয় স্তরে দুর্গাপুরকে ঘিরে ইস্ট কোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনা সামনে আসে। ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ-সহ পূর্ব ভারতের শিল্পাঞ্চলগুলির সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে দুর্গাপুর হয়ে উঠতে পারে বিনিয়োগের অন্যতম গন্তব্য।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, সেমি কন্ডাক্টর শিল্পের হাত ধরে এখানে মোবাইল উৎপাদন, ইলেকট্রনিক্স অ্যাসেম্বলি, ব্যাটারি ম্যানুফ্যাকচারিং, বৈদ্যুতিক গাড়ির যন্ত্রাংশ, ডেটা সেন্টার এবং হাই-টেক ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
নতুন শিল্প মানেই নতুন কর্মসংস্থান। সেমি কন্ডাক্টর ইউনিটের পাশাপাশি গড়ে উঠবে বহু আনুষঙ্গিক শিল্প, লজিস্টিক হাব, গুদামজাতকরণ কেন্দ্র, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান।
ফলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি, ইলেকট্রনিক্স, মেকানিক্যাল এবং ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের জন্য খুলে যেতে পারে নতুন সম্ভাবনার দরজা।
স্বাধীনতার পর ডিএসপি, এএসপি, এমএএমসি-সহ একাধিক বৃহৎ শিল্প সংস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল দুর্গাপুরের অর্থনীতি। পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও বীরভূমের লক্ষাধিক পরিবার এই শিল্পনগরীর উপর নির্ভরশীল ছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দেয়। বহু যুবক কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হন।
সেই প্রেক্ষাপটে সেমি কন্ডাক্টর প্রকল্পকে শিল্পের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
দুর্গাপুর পূর্বের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দুর্গাপুরের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে শিল্প এলে কর্মসংস্থান বাড়বে, অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরি হবে।
পাণ্ডবেশ্বরের বিধায়ক জিতেন্দ্র তেওয়ারি বলেন,
দুর্গাপুর, অণ্ডাল, পানাগড়, রানিগঞ্জ, পাণ্ডবেশ্বর-সহ সমগ্র শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন ঘটবে। পরিকাঠামো, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসবে।
যদিও শিল্পায়নের ঘোষণায় খুশি এলাকার মানুষ, তবে স্থানীয় যুবসমাজের স্পষ্ট দাবি, চাকরির ক্ষেত্রে স্থানীয় যোগ্য প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কর্মপ্রার্থী শ্যামল দাস, সুমিত রয় ও রিক্তা চক্রবর্তী সহ যুবক যুবতীরা বলেন,
আমরা শিল্প চাই, উন্নয়ন চাই। তবে স্থানীয় ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই প্রকৃত অর্থে এই শিল্পায়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
দুর্গাপুর স্মল স্কেল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য,
সেমি কন্ডাক্টর হাব এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টারের ঘোষণা অত্যন্ত ইতিবাচক। বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পও এর ফলে ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে। নতুন বাজার, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হবে।
সেমি কন্ডাক্টর হাব, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টার, ইস্ট কোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সবকিছু পরিকল্পনামাফিক বাস্তবায়িত হলে আগামী দশকে দুর্গাপুর আবারও পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান শিল্প, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসতে পারে।
শিল্পের নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় এখন শুধু দুর্গাপুর নয়, গোটা পশ্চিম বর্ধমান। বহুদিন পর শিল্পনগরীর আকাশে আবারও দেখা যাচ্ছে উন্নয়নের নতুন আলো।










