পশ্চিম বর্ধমান:
শারদোৎসবের ঢাকে কাঠি পড়তে আর বেশি দেরি নেই। সামনে বিশ্বকর্মা পুজো, দুর্গাপুজো, তারপর কালীপুজো। ইতিমধ্যেই পশ্চিম বর্ধমানের বিভিন্ন এলাকায় পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। কোথাও মণ্ডপের পরিকল্পনা, কোথাও আলোকসজ্জা, কোথাও আবার বাজেট নিয়ে বৈঠক। আর সেই সঙ্গে আর একটি প্রশ্নও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, বড় বাজেটের পুজোর বিপুল টাকা আসবে কোথা থেকে?
স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলের একাংশের দাবি, পুজোর চাঁদা তোলার নামে এবার তাঁদের উপর কতটা চাপ তৈরি হয়, তা নিয়েই এখন থেকেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বড় ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ছোট দোকানদার, কারও কাছেই যেন ‘চাঁদা’র অঙ্ক ছোট থাকছে না, এমন অভিযোগ উঠছে বিভিন্ন মহলে।
প্রশ্নটা এখানেই, পুজোর জন্য স্বেচ্ছায় দেওয়া চাঁদা আর চাপ সৃষ্টি করে টাকা আদায়ের মধ্যে সীমারেখাটা কোথায়?
পুজো বাঙালির আবেগ। পাড়ার পুজোকে ঘিরে ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ, ক্লাব ও পুজো কমিটির মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। কিন্তু সেই সম্পর্কের জায়গায় যদি ভয়, চাপ বা বাধ্যতামূলক অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটি নিছক ‘চাঁদা’ থাকে না, তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
বাজার মন্দা, ব্যবসায়ীদের উপর নতুন চাপ নয় কি?
পশ্চিম বর্ধমানের শিল্পাঞ্চলের অর্থনীতি এমনিতেই নানা চাপে রয়েছে। বহু ছোট ব্যবসায়ী ও দোকানদারের বক্তব্য, আগের মতো বিক্রি নেই। বাজারে ক্রেতার আনাগোনা কমেছে, ব্যবসার খরচ বেড়েছে, কর্মচারীর বেতন, দোকানভাড়া, বিদ্যুৎ, পণ্য কেনার খরচ, সব মিলিয়ে সংসার চালানোই অনেকের কাছে কঠিন হয়ে উঠেছে।
তার উপর যদি একাধিক পুজো কমিটির পক্ষ থেকে বড় অঙ্কের চাঁদার দাবি আসে, তাহলে ছোট ব্যবসায়ীদের উপর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা।
একজন ছোট ব্যবসায়ীর কথায়, “পুজো হোক, আমরা চাই। সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করতেও আপত্তি নেই। কিন্তু ব্যবসা না হলে হাজার হাজার টাকা চাঁদা দেব কী করে?”
এই প্রশ্নটাই এখন ঘুরছে শিল্পাঞ্চলের বাজারে।
বড় বাজেটের পুজো, প্রতি বছরই বিভিন্ন এলাকায় বড় বাজেটের পুজো হয়। থিম, মণ্ডপ, আলো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রচার, সব মিলিয়ে খরচের বহর বাড়ে। কিন্তু সেই বিপুল অর্থের উৎস কতটা স্বচ্ছ, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
পুজো কমিটিগুলির বক্তব্য অবশ্য আলাদা হতে পারে। তাঁদের দাবি থাকতে পারে, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা, বিজ্ঞাপন, অনুদান এবং অন্যান্য বৈধ উৎস থেকেই পুজোর অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
কিন্তু প্রশাসনের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ হল, স্বেচ্ছায় দেওয়া অনুদান এবং জোর করে টাকা আদায়ের মধ্যে পার্থক্য নিশ্চিত করা।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ওয়েবসাইটে দুর্গাপুজোর অনুমতি সংক্রান্ত অনলাইন ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে পুজো পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নজরদারির বিষয়টি নতুন নয়।
সরকারের কাছে
ব্যবসায়ীদের একাংশের সরাসরি প্রশ্ন,
“পুজো হবে, উৎসব হবে, আমরাও চাই। কিন্তু যদি কোনও কমিটি বা কোনও ব্যক্তি পুজোর চাঁদার নামে চাপ সৃষ্টি করেন, তাহলে প্রশাসন কী করবে?”
অভিযোগ উঠলে দ্রুত তদন্ত হবে কি?
ছোট দোকানদারদের উপর চাপ সৃষ্টি বন্ধ করতে পুলিশ সক্রিয় হবে কি?
চাঁদার নামে ভয় দেখানোর অভিযোগ এলে পুজো কমিটি হলেও কি একইভাবে আইন প্রয়োগ হবে?
বড় বাজেটের পুজোর অর্থের উৎস নিয়ে কি কোনও স্বচ্ছতা থাকবে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর পুজোর আগেই প্রশাসনের কাছ থেকে চান ব্যবসায়ীদের একাংশ।
উৎসবের আনন্দ যেন আতঙ্কে পরিণত না হয়।
দুর্গাপুজো কোনও ব্যক্তির বা কোনও গোষ্ঠীর একার নয়। এটি মানুষের উৎসব। ফলে পুজোর চাঁদা সংগ্রহও হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, সৌহার্দ্য এবং স্বেচ্ছাসহযোগিতার ভিত্তিতে।
প্রশাসনের কাছে তাই দাবি উঠছে, চাঁদা সংগ্রহের নামে কোথাও জোরজবরদস্তি, হুমকি বা ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠলে দল-মত-পুজো কমিটি নির্বিশেষে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
কারণ, উৎসবের নামে যদি একজন ছোট দোকানদারকে নিজের ব্যবসার টাকা থেকে জোর করে বড় অঙ্ক দিতে হয়, তাহলে সেই টাকা শুধু ‘চাঁদা’ নয়, তার সামাজিক ও প্রশাসনিক চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এবার পুজোর আগে পশ্চিম বর্ধমানে সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠছে,
“পুজোর চাঁদা কতটা স্বেচ্ছার, আর কতটা চাপের?”
উৎসবের মরশুম শুরু হওয়ার আগেই সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এখন প্রশাসনের কাছেও বড় পরীক্ষা।









