উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়, বারুইপুর : অবিভক্ত চব্বিশ পরগনার ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ প্রত্নতাত্ত্বিক কালিদাস দত্তের মজিলপুরের ঐতিহ্যবাহী বাড়িকে ‘হেরিটেজ ভবন’ ঘোষণা করে সরকারি অধিগ্রহণ ও সংগ্রহশালায় রূপান্তরের দাবিতে বারুইপুর মহকুমা শাসকের কাছে আবেদন জানানো হল।
বৃহস্পতিবার বিকেলে বারুইপুর মহকুমা শাসক চিত্রদীপ সেনের কাছে আবেদনপত্র জমা দেন ‘কালিদাস দত্ত স্মৃতিরক্ষা সমিতি’র প্রতিনিধিরা। উপস্থিত ছিলেন সমিতির সম্পাদক সঞ্জয় ঘোষ, কোষাধ্যক্ষ রমাপ্রসাদ চক্রবর্তী, উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য তথা বারুইপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান শক্তি রায় চৌধুরী, সদস্য বিশ্বজিৎ ছাটুই, গৌতম মণ্ডল, সাংবাদিক উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভোলানাথ হালদার। মহকুমা শাসক বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।
জয়নগরের মজিলপুরের জমিদার দত্ত পরিবারের সন্তান কালিদাস দত্ত (জন্ম: ১০ ডিসেম্বর ১৮৯৫ – প্রয়াণ: ১৪ মে ১৯৬৮) ১৯২৪ সালে জমিদারি দেখাশোনার কাজে গিয়ে বর্তমান রায়দিঘী থানার পশ্চিম জটা গ্রামে উত্তর ভারতীয় রেখ দেউল ঘরানার প্রায় ১০০ ফুট উঁচু একটি প্রাচীন মন্দির আবিষ্কার করেন। সেই ঘটনাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
তারপর থেকেই সুন্দরবনের দুর্গম অঞ্চলে—বাঘ, কুমির, সাপের ভয় উপেক্ষা করে—তিনি নৌকা ও পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। আবিষ্কার করেন জৈন, বৌদ্ধ ও হিন্দু সভ্যতার বহু ধ্বংসাবশেষ, কাঁচা ও পোড়া মাটির পুতুল, পাথরের হাতিয়ার, ধাতব মূর্তি, প্রাচীন মুদ্রা ও মাটির পাত্র।
তাঁর আবিষ্কৃত প্রত্নসম্পদ দেখতে দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতনামা পণ্ডিত তাঁর বাড়িতে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ননীগোপাল মজুমদার, স্টেলা ক্রেমরিশ, নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখ।
এই ঐতিহাসিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় উৎকীর্ণ ফলকে উল্লেখ রয়েছে, ১৮৬৪ সালে এখানে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস বিষবৃক্ষ-এর একটি অংশ এখানেই রচিত হয়েছিল বলে জানা যায়।
অবিভক্ত চব্বিশ পরগনায় প্রথম ব্যক্তিগত প্রত্নসংগ্রহশালা গড়ে তুলেছিলেন কালিদাস দত্ত। শুধু গবেষণাই নয়, তিনি প্রায় ১০০টিরও বেশি প্রবন্ধ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় পরবর্তীকালে ২৪ পরগনায় ২০-৩০টি সংগ্রহশালা গড়ে ওঠে।
সমিতির সম্পাদক সঞ্জয় ঘোষ জানান, “এই বাড়ি শুধু ইট-কাঠের নির্মাণ নয়, এটি বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক মূল্যবান নিদর্শন। সরকার যদি এটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করে সংগ্রহশালায় রূপান্তরিত করে, তবে তা আগামী প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।”
এখন দেখার, প্রশাসন এই আবেদন নিয়ে কত দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোয়।










