বিদায়ী আইসি দেবাশিস পান্ডা (বাঁ দিকে) এবং সদ্য দায়িত্ব পাওয়া আইসি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় (ডান দিকে)
বড়জোড়া (বাঁকুড়া) : আবারও আইসি বদল বড়জোড়া থানাতে। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যে আইসি দেবাশিস পান্ডা’কে সরিয়ে দেওয়া হল।নতুন দায়িত্বে আসছেন পুলিস ইন্সপেক্টর প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।
কিন্তু কেন বড়জোড়া থানার বড়বাবু দেবাশিস পান্ডা’কে সরিয়ে দেওয়া হল? বড়জোড়া এলাকার রাজনৈতিক মহলে, বিশেষ করে তৃণমূল মহলের বক্তব্য, পুলিস অফিসার দেবাশীষ পান্ডা একজন ভালো অফিসার। এবং মানুষ হিসাবে একজন সজ্জন ব্যক্তি। কিন্তু সেই দেবাশিসবাবুর ভাবমূর্তি নষ্ট করে দিলেন বড়জোড়া থানার ডাক মাস্টার এএসআই তরুণ কুমার।
অভিযোগ, এই ডাক মাস্টার আই সি’কে অন্ধকারে রেখে, কথার জালে আই সি দেবাশিসবাবুকে কার্যত ভুল বুঝিয়ে লোহা মাফিয়া শেখ নাদিম, চাঁদ গড়াই ও নবীন’কে দিয়ে লোহার সিন্ডিকেট শুরু করেন। এর পাশাপাশি, ডাক মাস্টারের দৌলতে বড়জোড়ায় কয়লা পাচারের বড়সড় চক্র সক্রিয় হয়ে উঠে।
পশ্চিম বর্ধমান জেলার রানিগঞ্জ এলাকা সহ ঝাড়খণ্ড রাজ্য থেকে বেআইনিভাবে কয়লা পাচারকারীরা বাঁকুড়ার বড়জোড়াতে দেদার চোরাচালান করছে। বড়জোড়া, মেজিয়া ও শালতোড়া হয়ে বাঁকুড়ায় চোরাই কয়লা পাঠানো শুরু হয়।
এছাড়া বেআইনিভাবে সাইকেল, বাইক ও ম্যাটাডোরে বস্তা ভরে কয়লা বাঁকুড়া হয়ে জঙ্গলমহলে পাচার শুরু হয় বলে তৃণমূলের একাংশ নেতা কর্মীরা জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, কিছুদিন ধরেই বেআইনি কয়লা পাচারের খবর পাওয়া যাচ্ছিল। সেই খবর উপর মহলেও পৌঁছায়। এমনিতে এই কয়লার উপর ইডি’র নজর রয়েছে। কয়েকদিন আগেই দুর্গাপুর, আসানসোল-সহ নয় জায়গায় ই ডি তল্লাশি চালিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কিছু দিন ধরে বেআইনি কয়লা কারবারের রমরমা হয়ে ওঠে বড়জোড়া এলাকা। আরও জানা গেছে, ওই ডাক মাস্টারের ইচ্ছাতে বেআইনি কয়লা, আকরিক লোহা, বালি কারবার রমরমা চলছে বড়জোড়াতে। কয়লা মাফিয়া সৈকত – এর মদতে চলছে বিভিন্ন চোরায় কারবার। অভিযোগ, কয়লা মাফিয়া সৈকতের সঙ্গে ওই ডাক মাষ্টারের ঘনিষ্ঠতা সর্বজনবিদিত।
কয়লা মাফিয়া সৈকতের অফিসে গিয়ে পড়ে থাকেন ওই ডাক মাস্টার। শ্যামসুন্দর এবং প্রমোদ তুরি নামে দুইজন চোর পুষে রেখেছেন ডাক মাস্টার। তাদেরকে দিয়ে প্রতিদিন রাতে বিভিন্ন কারখানায় চুরি করানো, বিভিন্ন গাড়ি আটক করে টাকা তোলা সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করানো হয়।
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, বাঁকুড়ার তালডাংরার আগে শিবডাঙা জঙ্গলে অবৈধ চোরায় কাঁটা আছে কয়লা মাফিয়া সৈকতের। ওই কাঁটাতে হলদিয়া ডক থেকে চোরা পথে আসা আকরিক লোহা মজুত করা হয়। এরপর সেই মজুত করা আকরিক লোহা ট্রাকে করে চোরাচালান করা হয় বড়জোড়ার বিভিন্ন কারখানায়।
পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, এর পাশাপাশি ঝাড়খণ্ড থেকে ৩০-৪০ ডাম্পার কয়লা রোজ আসে বড়জোড়ায়। সেই সব বেআইনি কয়লা সৈকতের অ্যাকাউন্টে পাচার হয় বড়জোড়ার বিভিন্ন কল- কারখানায়। এছাড়াও বিভিন্ন চোরায় স্ক্র্যাপ পাচার করা হয় বড়জোড়ার কয়েকটি কারখানায়। এইভাবে কোটি কোটি টাকার কারবার চালাচ্ছে কয়লা মাফিয়া সৈকত এবং ওই ডাক মাস্টার।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, চোরা কারবারিদের দৌরাত্ম্য দিনের পর দিন বেড়েই চলছিল বড়জোড়াতে। অথচ পুলিশ প্রশাসনের কোনও নজর নেই, হুঁশ নেই এইসব বিষয়ে। অবশ্য ওই কয়লা মাফিয়া প্রকাশ্য বলে বেড়ায়, জেলার উচ্চপদস্থ সমস্ত পুলিস অফিসারদের মোটা টাকা মাসোহার দিয়ে কিনে রেখেছে। নেতারাও সেই ভাগ পায়। তাই কয়লা মাফিয়া সৈকতের টিকি ছুঁতে পারে না পুলিশ। আরও জানা গেছে, ওই ডাক মাস্টারকে বড়জোড়া থানার অধিকাংশ পুলিশ থেকে সিভিক ভলান্টিয়াররা কেউ সহ্য করতে পারেন না।
এর পাশাপাশি, বড়জোড়া এলাকার কোনও মানুষ ওই ডাক মাস্টারকে পছন্দ করেন না। কারোর সাথে তাঁর সুসম্পর্ক নেই। আসলে ওই ডাক মাস্টার নিজেকে খুব চালাক মনে করেন। সবাই যে তাঁর কীর্তিকলাপ জানে, সবাই তার উপর নজর রেখেছে, সেটাই ডাক মাস্টার বুঝতে পারেন না। তিনি যে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকা তোলা তুলছেন সেটা সবাই জানে।
এই সম্পর্কে এক তৃণমূল নেতা বলেন, ওই ডাক মাস্টারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তদন্ত করলেই জানা যাবে, অনলাইনে প্রতিদিন কত টাকা ঢুকেছে।
এখন ঘটনা হল, নতুন আইসি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ওই ডাক মাস্টারকে সরিয়ে দেন কিনা, সেটাই দেখার। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, তা নাহলে, আবারও একই অবস্থা হতে পারে এবং বদনাম হতে পারে নতুন আইসি’র।










