লবণাক্ততা সহনশীল ফসল চাষের প্রসার, সবুজ শক্তির ব্যবহার, ম্যানগ্রোভ রোপণ, পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবারের দেখভাল এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ—সুন্দরবনের মানুষের জীবন সুরক্ষিত রাখতে এমনই একাধিক প্রস্তাব তুলে ধরল শিশু ও তরুণরা। এমনই মতামত উঠে এল ইউনিসেফ আয়োজিত এক আলোচনাসভায়।
ইউনিসেফ আয়োজিত ‘ইয়ুথ কনক্লেভ অন ক্লাইমেট অ্যাকশন’-এ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০০-র বেশি ছাত্রছাত্রী অংশ নেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব সম্পর্কে তরুণদের সচেতন করতে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই খ্যাতনামা পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়-এর তথ্যচিত্র Code Red Sunderbans-এর প্রথম পাবলিক প্রদর্শন হয়।
ছবিটি দেখার পর আলোচনায় অংশ নিয়ে তরুণরা ঘূর্ণিঝড়ের অভিজ্ঞতা ও প্রভাব নিয়ে নিজেদের মতামত জানায়। সুন্দরবনের ছাত্রছাত্রীরা জানায়, একের পর এক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে সেখানে মাটি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে এবং ধান-সহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিবেকানন্দ শিক্ষা নিকেতনের দশম শ্রেণির ছাত্রী তিতিক্ষা মণ্ডল বলেন, “লবণাক্ততা সহনশীল ধানের কিছু জাত চাষ করা হোক। একদিনে হবে না, কিন্তু সরকারের সহায়তায় সম্ভব বলে মনে করি।” তিনি জানান, ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কায় দ্বীপবাসীদের মনে কীভাবে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে। “শেষ জলোচ্ছ্বাসে দেখেছি, মানুষ কাদামাটির বাঁধে পাশাপাশি শুয়ে খড়ের আঁটি জড়িয়ে ধরে বাঁধ ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে,” বলেন তিনি এবং কলকাতার মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান।
রাজ্যের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সিভিল ডিফেন্স মন্ত্রী জাভেদ খান তরুণদের আশ্বস্ত করে বলেন, “দ্বীপবাসীদের কষ্ট কমাতে রাজ্য সরকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করছে এবং একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করছে। দ্রুত রোগী পরিবহনের জন্য সুন্দরবনের বিভিন্ন জায়গায় স্পিডবোটে অ্যাম্বুল্যান্স চালু করা হচ্ছে।”
ইউনিসেফ রাজ্য সরকার ও তরুণদের সঙ্গে মিলিতভাবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কাজ করছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ডা. মনজুর হোসেন বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানো শুধু বিজ্ঞানীদের কাজ নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব। তরুণরাই পরিবর্তনের দূত, তাই আমরা চাই তারা নিজেদের ভাবনা তুলে ধরুক।”
শহরের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও স্বীকার করে যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সুন্দরবন বা উপকূলেই সীমাবদ্ধ নয়। এক কলেজছাত্র শুভন দাস বলেন, “কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য এলাকাও এর প্রভাব অনুভব করছে। অল্প সময়ে প্রবল বৃষ্টি ও গত বছরের দুর্গাপুজোর আগে জলজমার ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনেরই ফল।”

কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে বসবাসকারী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-এর ছাত্রী অনন্যা বলেন, “প্রতিটি ঝড়ের পর সুন্দরবনের মানুষ কাজের খোঁজে এখানে আসে। আজ থেকে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করব।”
অন্যান্য ছাত্রছাত্রীরা অনলাইনে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ ও সবুজ শক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়। দেশবন্ধু কলেজ ফর গার্লস-এর ছাত্রী অঙ্কিতা কর্মকার বলেন, “যুবসমাজ হিসেবে অন্তত সচেতনতা বাড়ানো আমাদের কর্তব্য। প্রতিষ্ঠান ও কলেজে সোলার প্যানেল বসিয়ে সবুজ শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং টেকসই জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হবে।”









