জয়ন্ত মণ্ডল
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর (এসআইআর) কাজ—গণতন্ত্রের জন্য জরুরি এক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই কাজই আজ একের পর এক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও) একটার পর একটা মৃত্যুর ঘটনা যখন সামনে আসছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—কেন সাধারণ সরকারি কর্মীরা দেশের গণতন্ত্রের খাতিরে নিজের জীবন পর্যন্ত হারাতে বাধ্য হচ্ছেন?
জলপাইগুড়ির মাল ব্লকের অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ও বিএলও শান্তি মনি এক্কা ছিলেন এক আদিবাসী মহিলা। পরিবারের অভিযোগ, দিনের পর দিন অকল্পনীয় চাপ, অবাস্তব টার্গেট এবং ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন। পূর্ব বর্ধমানের মেমারির নমিতা হাঁসদাও সেই চাপ থেকে পালাতে পারেননি। অতিরিক্ত কাজের বোঝা, রাতদিনের ক্লান্তি—শেষ পর্যন্ত তাঁর শরীর সইতে পারেনি।
ঘটনা এখানেই শেষ নয়। নদিয়ার ষষ্ঠীতলায় রিঙ্কু তরফদার, ৫১ বছরের একজন পার্শ্বশিক্ষিকা ও বিএলও। তাঁর সুইসাইড নোটের প্রতিটি শব্দ শিউরে ওঠার মতো—তিনি লিখেছেন, কাজ তুলতে না পারলে প্রশাসনিক চাপ আসবে এবং তিনি আর সেই চাপ সইতে পারবেন না। মৃত্যুর দায় তিনি নির্বাচন কমিশনের উপরই ঠেলে দিয়ে গিয়েছেন।
এর পাশাপাশি রয়েছেন হুগলির কোন্নগরে তপতী বিশ্বাস, যিনি অতিরিক্ত চাপ সামলাতে গিয়ে সেরিব্রাল অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে লড়াই করছেন। একের পর এক মৃত্যু, অসুস্থতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
এই ঘটনা শুধু বাংলায় নয়। গুজরাটের গির সোমনাথ জেলার কোডিনারের ৪০ বছরের শিক্ষক অরবিন্দ মুলজি ভাধেরও ছিলেন বিএলও। তাঁর সুইসাইড নোটে লেখা—
“এসআইআর-এর কাজের প্রবল চাপ আমি নিতে পারছি না। তাই এই সিদ্ধান্ত।”
অরবিন্দের মৃত্যুর পর গুজরাট জুড়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিএলও–রা। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, এই সব মৃত্যুর পরেও কি প্রশাসনের কাছে এই মানুষগুলোর কোন মূল্য আছে?
চাপ শুধু কাজের নয়—একটা অনুচ্চারিত ভয়ও আছে। ভুল করলেই শাস্তি, দেরি হলেই তিরস্কার। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম সংগ্রহ, রাতভর ডেটা আপলোড—মানুষ নয়, যেন কোন যান্ত্রিক শ্রমিক এই কাজ করছে।
এমন অনেক বিএলও আছেন, যাঁরা কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষ নন। কারণ তাঁদের কাজ চক-ডাস্টার, পেন-খাতা নিয়ে। স্মার্টফোন বা অ্যাপ-ভিত্তিক ডেটা আপলোডের পুরো প্রক্রিয়াটাই অনেকের কাছে নতুন ও বিভ্রান্তিকর। ফলে কাজ করতে গিয়ে বারবার ভুল হচ্ছে, লোড হচ্ছে না, সার্ভার স্লো—আর এইসবই বাড়াচ্ছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অপমান ও ভয়ের অনুভূতি।
এই ঘটনাগুলির মধ্যে যে মানবিক বিপর্যয় লুকিয়ে আছে, তা কোনও পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো যাবে না। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনেই এক অদৃশ্য ব্যবস্থাগত নিষ্ঠুরতার ছায়া স্পষ্ট। এই কর্মীরা কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য কিনা বড় কথা নয়, তাঁরা সাধারণ মানুষ, যাঁরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে দিনের পর দিন দরজায় দরজায় ছুটে বেড়িয়েছেন।
একটি মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে, অপরিকল্পিত ভাবে শুরু হওয়া এসআইআর বিএলওদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। বহু কর্মী মানসিক অবসাদে ভুগছেন। রাজনৈতিক হোক বা প্রশাসনিক, এর পিছনে যে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ রয়েছে, তা অস্বীকার করা যায় না।
সব মিলিয়ে এই প্রশ্নটাও উঠছে, আমরা কি এমন একটি দেশের পথে হাঁটছি, যেখানে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে গিয়ে সাধারণ মানুষের অযাচিত মৃত্যুকে বেমালুম মেনে নেওয়া হবে?











One Comment