Home / প্রবন্ধ / রোববারের লেখা / ক্যালকাটা জার্নালিস্টস ক্লাবের আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের অনন্য রূপ

ক্যালকাটা জার্নালিস্টস ক্লাবের আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের অনন্য রূপ

কোলফিল্ড টাইমস: ক্যালকাটা জার্নালিস্টস ক্লাব আয়োজিত আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে নানা বিষয়ভিত্তিক ছবির সমাবেশ শিল্পপ্রেমীদের নজর কেড়েছে। প্রকৃতি, মানুষ ও দৈনন্দিন জীবনের মুহূর্তের পাশাপাশি স্থাপত্য ও ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে তোলা একাধিক আলোকচিত্র নিজস্ব শৈল্পিক মহিমায় প্রদর্শনীকে বিশেষ মাত্রা এনে দিয়েছে।

একজন আলোকচিত্রশিল্পীর জগৎ সচরাসচর পল্লীপ্রকৃতি, দেশের নানা উৎসবে, জানা-অজানা বিভিন্ন প্রান্তর, স্থাপত্য ও ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। নতুন করে বলার নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় স্মৃতিসৌধ, স্থাপত্য ও সূক্ষ্ম ভাস্কর্যের ঐতিহ্য হল সভ্যতার আত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিচ্ছবি। ক্যালকাটা জার্নালিস্টস ক্লাবের প্রদর্শনীতে তেমনই কিছু প্রাচীন স্থাপত্য, ভাস্কর্যের নিদর্শন আলোকচিত্রের মাধ্যমে উঠে এসেছে। সেগুলির মধ্যে থেকেই কয়েকটি তুলে ধরা হল।

১) ইসলামিক স্থাপত্যের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিদ্রযুক্ত জাফরি। আলো-বাতাস চলাচল অথবা তীব্র রোদ থেকে সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হতো জাফরি নকশা। আলোকচিত্রী সৃঞ্জয় দাসের লেন্সে ধরা পড়েছে নকশা করা জাফরি।

২) আলোকচিত্রী ডা. নির্মাল্য চক্রবর্তীর ক্যামেরায় রাজস্থানের রণথম্বোর অভয়ারণ্যতে বাঘের নানা মুহূর্ত লেন্সবন্দি হয়েছে। অভয়ারণ্যতে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের বহু নিদর্শন। একসময় জয়পুরের মহারাজারা এখানে শিকার করতেন। ফোর্টের ভগ্নাবশেষের মধ্যে মানসিংহের নির্মিত ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যে গম্বুজাকৃতির এক বিশেষ ছই বা ছত্রি নজর কাড়ে। ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও বন্যপ্রাণীর এক সহাবস্থান আলোকচিত্রীর লেন্সে ফ্রেমবন্দি হয়েছে।

৩) আলোকচিত্রী স্বর্ণাভ মিত্র তুলেছেন পুরাণে বর্ণিত বিষ্ণুর একমাত্র নারী অবতার দ্বাদশ শতাব্দীর মোহিনী রূপের মূর্তি। এটি পশ্চিম চালুক্য সাম্রাজ্যের একটি নিদর্শন। যা বর্তমানে দিল্লির জাতীয় সংগ্রহালয়ে রয়েছে। যার রূপে মুগ্ধ হয়ে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন স্বয়ং মহাদেব।

৪) পোড়ামাটির দেশ। বাংলায় মন্দির নির্মাণ ও অলংকরণে ইঁটের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। আলোকচিত্রী প্রশান্ত গঙ্গোপাধ্যায় ফ্রেমবন্দি করেছেন বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটি সংস্কৃতি। ষোড়শ শতক থেকে বাংলায় পোড়ামাটি শিল্পের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। বিষ্ণুপুরের এক ভগ্ন তোরণ আলোকচিত্রের মাধ্যমে উঠে এসেছে।

৫) কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল চত্বরে ঘোড়ার পিঠে সাহেব মূর্তিটি ব্রিটিশ আমলের স্মৃতি বহন করছে। বাঙালির আবেগ, প্রেম ও বিষাদ নিয়ে শহরের অন্যতম প্রধান এই পর্যটন কেন্দ্র। আলোকচিত্রী ডা. অর্ণব মণ্ডলের ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়েছে রাতের মায়াবী আলোয় ঘোড়ার পিঠে সাহেব মূর্তি সহ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।

৬) আলোকচিত্রী নেহা শর্মা তুলে ধরেছেন বাংলার রথযাত্রা উৎসব। তার ছবিতে এসেছে বাংলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মহিষাদল রাজবাড়ির কাঠের রথ। ১৩টি চূড়া বিশিষ্ট রথকে ঘিরে দর্শনার্থীরা। যা মহিষাদলের বাড়তি আকর্ষণ।

৭) বিশেষভাবে সক্ষম আলোকচিত্রী সৌমজিৎ দে নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সকল চ্যালেঞ্জ জয় করে নেন। তিনি শিল্প প্রতিভার অধিকারী। হুগলি জেলার ধনিয়াখালির কাছে সুবিশাল দশঘড়া জমিদার বাড়ির স্থাপত্যের ইতিহাস তার ক্যামেরার লেন্সে উঠে এসেছে।

৮) উত্তর কলকাতার অলিগলি, কড়ি-বরগা, খিলান ও বারান্দা হলো শহরের অতীত ঐতিহ্য। আলোকচিত্রী মৌমিতা গঙ্গোপাধ্যায় পুরনো কলকাতা ঘুরে দেখতে ভালোবাসেন। ভ্রমণের নেশায় বারবার সেই স্বাদ পেতে ক্যামেরাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসেন সেই সময়ের স্মৃতিদের কাছে। তার ক্যামেরার ফ্রেমে আটকোণা আকৃতির স্থাপত্য বিষয়ক ছবিটি মহাত্মা গান্ধী রোডে মাধো ভবনের।

৯) উত্তরাখণ্ডের শৈলশহর নৈনিতাল। আলোকচিত্রী সৌমাভ রায় লেকের পাশে আলোছায়া ঘেরা ব্যালকনির রেলিং যেন গল্প বুনছে অল্পস্বল্প। অঞ্জন দত্তের গাওয়া জনপ্রিয় গান ‘খাদের ধারের রেলিঙটা’ বাঙালির খুব প্রিয়। নৈনিতালে চিড়িয়াখানার দিকে যেতে আলোকচিত্রী এই মুহূর্তকে ফ্রেমবন্দি করেছেন।

১০) আলোকচিত্রী রানা চক্রবর্তীর ক্যামেরায় ভালোবাসার সৌধ। ভারতের আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে তাজমহল ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, যা মুঘল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

আলোকচিত্র সাধারণভাবে স্থির মনে হলেও তার সচল প্রকাশ মানুষকে ভাবিয়ে তোলে গভীরভাবে। সকলের আবেগকে স্পর্শ করে। আর সেই মুহূর্তকে সৃষ্টি করার কারিগর হলেন একজন শিল্পী। ১৩ মার্চ, শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া ক্যালকাটা জার্নালিস্টস ক্লাবের প্রদর্শনী চলবে ১৫ মার্চ, রবিবার পর্যন্ত। তিনটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত গ্যালারির সময়। আইসিসিআরে শুরু হওয়া ক্যালকাটা জার্নালিস্ট ক্লাবের আলোকচিত্র প্রদর্শনীটি ঘিরে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। শহরের বুকে বহু বছর ধরে এই দায়িত্ব পালন করে চলেছে ক্যালকাটা জার্নালিস্টস ক্লাব।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *