রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ভারতবর্ষকে বুঝতে হলে বিবেকানন্দকে পাঠ করতে হবে। অন্যদিকে, মা সারদা শিখিয়েছিলেন জাতপাতের অহংকার মুছে কীভাবে সকলের ‘দাসানুদাস’ হতে হয়। লিখলেন অরুণাভ গুপ্ত
বলেই ফেলি
দুটো বিস্ফোরক উক্তি মনে পড়তেই নতুন করে দেহ-মন নিমেষে চাঙ্গা হল। যেমন- Romain Rolland-কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার লেখেন, ‘যদি ভারতবর্ষকে বুঝতে চান তবে বিবেকানন্দ পাাঠ করুন। (দেখবেন) তাঁর মধ্যে সবকিছুই ইচিবাচক, নেতিবাচক কিছুই নেই’। দুই-এক রাতে মা সারদা নিজেই এক নিচু জাতের মানুষের শৌচাগার পরিস্কার করার সময় জগজ্জননীর কাছে প্রার্থনা করেন, ‘মা আমি ব্রাহ্মণ, আমি উঁচু জাতের- আমার এই অহঙ্কার দূর কর। আমি যেন সকলের দাসানুদাস হতে পারি’। ভারতবর্ষের নাড়িতে সেবা। যে আত্মা ভবিষ্যতে ভারতকে খাওয়াবে, তাঁকে এমন মায়ের হাতে ভাত খেতে হয়। ভবিষ্যতের শক্তির পিছনে কাজ করে থাকে এক গভীর করুণা আর অদ্ভূত মাতৃস্নেহ।
কেন বললাম
ভারতে…শুধু ভারতে কেন, পুরো বিশ্বে এমন কোনো একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যাকে দেখিয়ে বলা যায়- এঁকে জানুন, বঝুন তাহলেই এই দেশের সব জানা হয়ে যাবে। বা একই ভাবে ওই মা পেলাম না যিনি বলতেন- ভয় কি বাবা জানবে একজন মা আছেন তোমাদের সঙ্গে। অবশ্যই আছেন, তবে তাঁরা সর্বজনীন নন।…আর তখনই সৃষ্টিছাড়া অবোধ্য ভয়, আতঙ্ক ঘিরে ধরে। কেন, শাট-আপ, বিশ্বসমাজে প্রশ্ন করা অন্যায়। কিছু মানুষ বলবে, বেশি মানুষ শুনবে, মুখস্থ করে বেদবাক্য বলে গেঁথে নেবে। প্রভূত্বের ডঙ্কা…।
মহাশ্বেতাদেবীর ‘অরণ্য়ের অধিকার’ উপন্যাসের এক বিশেষ অংশ বলছে, দিকু ঘোড়া চায়, মুন্ডা পয়সা দিবে। দিকু পালকি চায় মুন্ডা দাম দিবে, কাঁধে বইবে। দিকু যা চায় সব মুন্ডা দিবে। অগত্যা বিশ্বাস করো বা না করো মুখের লাগাম যেন ঢিলে না হয়। তোমার ভয়, অস্বস্তি সব তোমার সম্পত্তি, কেউ কোনো সাজেশন দেবে না। সো- সহ্যশক্তি বাড়াও এবং নির্লিপ্ত থাকো।
আ বিগ জিরো
আমি আমাকে দুষছি। এখানে আমার ভূমিকা সংকলকের। মন অবশ করা কিছু অসামান্য বক্তব্য এক স্থানে গেঁথেছি আন্তরিক শ্রদ্ধায়। এ তো শুধু সুন্দর সৃষ্টি নয়, সর্বকালীন সত্য। আবার বলি লেখা শেষ করব আরও এক অসাধারণের অসাধারণ বক্তব্য দিকে, বাচনের এই ‘আমরা’ যদি কখনো হয়ে ওঠে ‘আমি’? প্রভূত্বের ওজনটা তখন আরও বেশি সামনে চলে আসে।…আমরা অনেক সময়ই সকলের করা কাজটাকে বলতে শুরু করি ‘আমার কাজ’। ব্যক্তিগত স্তর থেকে সামাজিক-রাজনৈতিক স্তর পর্যন্ত এই ‘আমি’ তখন হয়ে ওঠে ঘোষণা-শব্দ, চিৎকার-শব্দ, যার মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে অকারণ একটা জোর দিয়ে বলার প্রতাপ ভঙ্গি। আর সেই চোরাপথে এগিয়ে আসে ফ্যাসিবাদ। এই ফ্যাসিবাদ আমাদের স্বভাবের একটা অনিয়ন্ত্রিত চিৎকার। (শঙ্খ ঘোষ: অন্ধের স্পর্শের মতো, ১৪১৪)










