Home / প্রবন্ধ / রোববারের লেখা / নারী দিবসের চেতনা অজ্ঞাত যুদ্ধরত এক নারীর ভাস্কর্য

নারী দিবসের চেতনা অজ্ঞাত যুদ্ধরত এক নারীর ভাস্কর্য

মুক্তেশ্বরের দেওয়ালে যুদ্ধরত নারী

মুকুট তপাদার

স্বামীজি বলতেন, “যে জাতি নারীদের সম্মান দিতে জানে না, তারা কখনো উন্নত হতে পারে না।”

নারী জাগরণ মানেই সমাজের জাগরণ। বহুকাল ধরেই নারীরা সাহস, আত্মত্যাগ ও শক্তির স্বীকৃতি বহন করেছেন। এককালে পুরুষতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্য সমাজের বহু বাধা সয়েও মাথা উঁচু করে নারীরা লড়াই করে গেছেন। তাদের হাতেই ছিল জাতির ভবিষ্যত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা দাসত্বের হাতকড়া ভেঙে স্বাধীন মত প্রকাশ করেছেন।

ভয়ানক ইয়ালির ওপরে নারী যোদ্ধা

ইতিহাসের বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিতরের পদ্মাবতী, রানি দুর্গাবতী, রায়বাঘিনী মহারানি ভবশঙ্করী, রানি ভবানি, রানি লক্ষ্মীবাঈ, সাধনী, প্রীতিলতার মতন বীরাঙ্গনারা ভারতীয় নারীদের স্বপ্ন পূরণে উৎসাহিত করেছেন। সমাজে প্রাচীনকাল থেকে নারীরা দীর্ঘ সংগ্রাম করে আসছেন। শত লাঞ্ছিত হয়েও তাদের হৃদয় বজ্র, বিদ্যুৎ, অনল। সে যুগে নারী যুদ্ধেও যেতেন। তারা যেন শক্তি রূপে আবির্ভূতা।

গ্রিক পুরাণে বর্ণিত ‘আমাজন’ নামক বীর জাতির কথা জানা যায়। তারা ছিলেন যুদ্ধে সবচেয়ে দক্ষ। হোমারের ইলিয়াডে বিবৃত ট্রয়ের যুদ্ধে আমাজন জাতির এক অজানা দিক উঠে আসে। এনাদের ছিল একদল নারী যোদ্ধা। আমাজনের নারী যোদ্ধারা গ্রীকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। এই যাযাবর নারী যোদ্ধারা কৃষ্ণ সাগরের উপকূলে বাস করত। শোনা যায়, আমাজনের সাহসী নারী যোদ্ধাদের গল্প প্রাচীন ভারতে বিস্তৃত ছিল। প্রাচীনকালে মৃৎশিল্পে আমাজন নারী যোদ্ধাদের পাওয়া যায়। ভারতে দশম শতাব্দীর শিল্পকর্মতে ভারতীয় বীর নারী যোদ্ধাদের রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।

প্রাচীন ভারতের বহু ভাস্কর্য ও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মূর্তিতে নারীদের পরাক্রমশক্তি দেখা যায়। তাদের নিরন্তর লড়াই প্রাণিত করে প্রতিটি দিন। এমন নিদর্শন পাওয়া যায় যে, গুপ্ত যুগে নারীরা সশস্ত্র প্রহরী হিসেবে প্রাসাদের সুরক্ষায় নিয়োজিত থাকতেন। আবার কুষাণ যুগে নারীদের তীরন্দাজ ও সশস্ত্র যোদ্ধার বেশে দেখা গেছে। বঙ্গের পোড়ামাটি শিল্পে সামাজিক চিত্রে উঠে এসেছে বহু ব্যতিক্রমী চিত্র।

সোমবংশী রাজাদের নির্মিত ভুবনেশ্বরের বিখ্যাত মুক্তেশ্বর দেবালয় কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলীর রত্ন। বিশেষ কিছু মহামূল্যবান ভাস্কর্য দ্বারা সজ্জিত এই পাথুরে দেবালয়টি। শিবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত মুক্তেশ্বর। দেবালয়ের গায়ে এক বিশেষ ভাস্কর্য মানুষকে মুগ্ধ করে। প্রাচীন শিল্পকলাটি ফুটিয়ে তুলেছে রণাঙ্গনে নারীর পরাক্রমকে।

যোদ্ধা বেশে অস্ত্র হাতে এক নারী বসে আছেন পৌরাণিক এক ভয়ংকর প্রাণী ইয়ালির ওপর। বেলেপাথরের নির্মিত ভাস্কর্যটির মধ্যে সকল প্রতিকূলতা জয়ের অদম্য মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায়। যা শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। অস্ত্র হাতে এক মূর্তি আছে একদম নিচে। পুরো ভাস্কর্যটি পৌরাণিক যোদ্ধা চিত্র।

অতীতে শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন বীরাঙ্গনারা। পুরুষ যোদ্ধারা ও প্রতিপক্ষ হিসেবে শক্তিশালী দানবদের সঙ্গে মিলে যোদ্ধা নারীদের রূপ বিভিন্ন মন্দির স্থাপত্যে চিত্রায়িত। যা সক্রিয় অংশগ্রহণের বার্তা দেয়। রাজধর্ম পালনে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। যাতে সাধারণ মানুষ শান্তিতে বাস করতে পারেন। এই গৌরবগাথা আজ প্রাচীন দেবালয় মুক্তেশ্বরের স্থাপত্য নিদর্শনে।

আমাজন জাতির নারী যোদ্ধা

ভাস্কর্য নারীর সক্ষমতার চিত্র তুলে ধরে। ভারতীয় শিল্পকলায় নারী শুধুমাত্র সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং শক্তির প্রতীক। মন্দিরের দেওয়ালে এই ভাস্কর্য সেই সাহসের প্রতিচ্ছবি।

ইয়ালি প্রাণীটি দেখতে ভয়ংকর। সিংহ-হাতির সংমিশ্রণ রূপে সৃষ্টি। ইয়ালি হলেন দেবালয়ের রক্ষাকর্তা। প্রাণীটির লেজ সাপের মতন। ভারতের বহু প্রাচীন স্থাপত্যে ইয়ালিকে দেখা যায়। মুক্তেশ্বরের ভাস্কর্যটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অশুভ শক্তির বিনাশ ও নারী শক্তির জয়। বহু যুগ ধরে বলিষ্ঠ চিত্রণটি অতীতের সাক্ষী হিসেবে ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

তথ্যসূত্র: দেবলা মিত্র/আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI)

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *