Home / প্রবন্ধ / রোববারের লেখা / নদীর ধারে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা সাহেব কুঠি

নদীর ধারে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা সাহেব কুঠি

মুকুট তপাদার

একটা ক্ষীণ রৌদ্রের রেখা বাড়িটির ওপর এসে পড়েছে। গঙ্গা পাড়ে ধোঁয়াশার মত তুলির কয়েকটি আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা মূর্ত ছবিটি এক সুবিশাল সাহেবি আমলের কুঠিবাড়ি। বিশ্বজনীন অস্তিত্বের সংকটে এও যেন এক গভীর সংকট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নদীর কাছে যাবার কথা ছিল! কিন্তু নদীতো পাড় ভেঙে ক্রমশ এগিয়ে আসছে বাড়ির সিঁড়ির কাছে। শূন্যতা নিভৃতের মাঝে বাড়িটিতে পাখিরা বাসা নিয়েছে। ভেতরে পরিত্যক্ত সব, ভাঙা জানালার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে তারা আকাশে বিষন্নতার মেঘ দেখে। কুঠিবাড়ির চারিধারে গলা টিপে ধরেছে শিকড়-বাকড়। দেওয়াল ভেঙে কিছুদূর গিয়ে পথ হারিয়ে বেঁচে থাকার নিহিত সম্ভাবনার মতো উঠে আসছে ক্রমশ। এর কোনও আজ উত্তরপুরুষ নেই। বর্তমান সময় এ বাড়ির ভবিষ্যৎ কি? কেউ আর প্রশ্ন করে না। সময়ের সাক্ষ্য বহন করে প্রবাহিত হচ্ছে ভাবিকালের দিকে। তখন তাকে খুঁজে নেওয়ার আগে জানতে হবে কিছু ইতিহাস।

বাঙালির অতীতের ভার বিপুল। গঙ্গার ধার ধরে দেওয়ানি বা বেনিয়াগিরির – এমন হরেক রকম বিষয় ছিল বরানগরের সঙ্গে। প্রাচীন জনপদ বরানগর। নগরটি দেখেছে এককালে বণিক পুঁজির আগমন। আবার অর্থনীতির ভাঙ্গন, নতুন জনপদ হিসেবে জীবিকা ও সামাজিক বিন্যাস। এই বিস্তৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মোসাহেবি কালচার। সধবার একাদশীতে নিমচাঁদের সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘এক ব্যাটা বড় মানসের ছেলে মদ ধল্লে দ্বাদশটি মাতাল প্রতিপালিত হয়।’ বাবু রামলোচন ঘোষ, পাথুরিয়াঘাটার বিখ্যাত ঘোষ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। ওয়ারেন হেস্টিংসের অত্যন্ত আস্থাভাজন দেওয়ান। একঅর্থে হেস্টিংসের বেনিয়া। গুড়ুকে টান, বাবুয়ানা, দালালি, দোভাষী করে সাহেবদের অনুসরণ করেন। হেস্টিংসের বাগানটি বর্তমানে কালের আবর্তে হারিয়েছে। টিকে থাকার মধ্যে আছে রামলোচন বাবুর ঘাট। সেই ঘাটের পাশে এই সাহেব কুঠিবাড়ি।

পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ কোম্পানি আমলে দেশের নানাদিক থেকে বড় বড় জাহাজ এসে নোঙর করত ঘাটগুলোয়। বরানগরে ডিঙি, পাঁইজাল, বজরার মত নৌকা নদীপথে চলাচল করত। সংলগ্ন ঘাটে গড়ে ওঠে ইউরোপীয়দের পাট উৎপাদনের কেন্দ্র। নদীপথে আনা-নেওয়া করা হতো পণ্যবাহী নৌকায় দেশীয় সব পণ্য। আজও বরানগরের কিছু পুরোনো বাড়ি, ভগ্নপ্রায় দেওয়াল আর গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্থাপত্য সেই সাহেব আমলের স্মৃতি বহন করছে।

১৮৫৯ সালে জর্জ হেন্ডারসন সাহেব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চেষ্টায় বরানগরে একটি পাটকল প্রতিষ্ঠা করেন। বোর্ণিয় কোম্পানি এই কৃতিত্বের পেছনে ছিল। গঙ্গার পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে এটিই ছিল দ্বিতীয় পাটকল। এরজন্য বরানগরের সামাজিক জীবন ও অর্থনীতিতে বিপুল সাফল্য এসেছিল। অবশ্য যে জায়গার উপর এই পাটকলটি নির্মাণ হয় সেখানে আগে ছিল স্থানীয় জমিদার দুর্গাচরণ মুখোপাধ্যায়ের জমি। সাহেবের কুঠিবাড়িতে একসময় পাটকলের কাজকর্ম চলতো। স্থানীয় মানুষরা একে সাহেব কুঠি নামে ডাকে। নিঃশব্দ স্মৃতি বহন করে আজ সে দাঁড়িয়ে আছে। দেওয়ালগুলো মোটা, চুন-সুরকির গাঁথুনি, কোথাও কোথাও শেওলা জমে সবুজ ছোপ ফেলেছে—সময়ের ছাপ স্পষ্ট।

বাড়ির সিড়িতে দাড়িয়ে নদীতে বয়ে চলা জলের শব্দ শোনা যায়—কখনও শান্ত, কখনও ঢেউয়ের ধাক্কায় উত্তাল। জোরে হাওয়া দিলে পুরোনো কাঠের জানালাগুলো কঁকিয়ে ওঠে। চারপাশে হয়তো একসময় সুন্দর বাগান ছিল—এখন তা কিছুটা জঙ্গলাকীর্ণ, তবুও কোথাও পুরনো নকশা অতীতের সৌন্দর্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। সন্ধ্যা নামলে বাড়িটা আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে আছে শত বছরের গল্প। নদীর পাড় ধরে ভেসে আসে নৌকারা, তাদের হালকা আলো আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে চারদিক ভরে ওঠে। মনে হয়, কুঠি বাড়ির দেওয়ালগুলো যেন কত গল্প, কত ইতিহাস লুকিয়ে রেখেছে। এককালে সাহেবদের আসা-যাওয়া, মজলিস, আবার হয়তো একাকিত্বের দীর্ঘ ছায়াও। শুধু এক স্থাপত্য নয়, এ যেন সময়ের জীবন্ত সাক্ষী।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *