রক্ষিত বাড়ির ফেয়ারি গার্ডেন
মুকুট তপাদার
ফরাসডাঙার লালবাগান, জাহ্নবীতটে অঞ্চলটির মহিমা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে। কিন্ত সময়ের সাথে সাথে এখানকার গুরুত্ব বিস্মৃতির আড়ালে। উত্তরসূরিদের জন্যে পরিচয় করা বিশেষ দরকার। ফরাসডাঙ্গার লালবাগানের গলি ঘুঁজি, পথ, বাসভূমি, অন্দরের কত ইতিহাস চাপা পড়ে। রূঢ় ব্যস্ত জীবনে হাতে গোনা কজন তার খোঁজ রাখে।

লালবাগানে দুর্গাচরণ রক্ষিতের বাড়ি
তখন গঙ্গাতীরে সেকালের চন্দননগর মুখে মুখে ফরাসডাঙা। বহু বিখ্যাত মণীষীদের-সমাগমে পূণ্যভূমি। ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আবাস ও প্রশাসনকেন্দ্র।

রক্ষিত বাড়ির ভেতরের উঠোনে সাবেকি ধাঁচের দুর্গাদালান
১৭৩০ এর আশেপাশে গভর্নর ডুপ্লের সংস্কার ফ্রান্সের বাণিজ্যিক এলাকায় মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ব্রিটিশরা তখনও সুবিধা করতে পারেনি। লালবাগান আজ বয়সের ভারে অনেকটাই প্রবীণ, তবু শোভিত সুন্দর। লালবাগান সংস্কারকদের জন্ম ও কর্মভূমি। এখানকার অধিকাংশ স্থানীয় বাসিন্দারা ফরাসি ভাষা জানেন। তারা নিয়োজিত আছেন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও দাপ্তরিক কাজে।

ভোলানাথ দাসের বাড়ির একটি দৃশ্য
বিখ্যাত বাঙালি ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী দুর্গাচরণ রক্ষিত লালবাগানে বাস করতেন। শোনা যায়, এককালে রক্ষিত পরিবার ছিল তন্তুবায়। ফরাসডাঙা ছিল তন্তু বয়ন শিল্পে অন্যতম সেরা। রক্ষিত বাড়ির দুর্গা দালানের জৌলুস আজ অনেকখানি ফিকে। স্থানীয় মানুষদের মতে এখন আর জমকালো নেই রক্ষিত বাড়ির চেহারা। তবে যেটুকু আছে তার ঔজ্জ্বলতা কম নয়।

ভোলানাথ দাসের এই বাড়িতে মেয়েদের বিদ্যালয় স্থাপন হয়
দুর্গাচরণ রক্ষিত বহু দেশীয় পণ্য ইউরোপে আমদানি করতেন। বিশাল সব জাহাজ বোঝাই করে বিদেশে পাড়ি দিত। তাঁর ছিল ‘দুর্গা চরণ রক্ষিত অ্যান্ড কোম্পানি’। প্রথম বাঙালি যিনি ‘লে’জিয়ঁ দ’ন্যর’ অর্থাৎ ফরাসি সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েছিলেন। গরীব ছাত্র-ছাত্রীদের স্কলারশিপ, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, দাতব্য চিকিৎসালয় নির্মাণ ইত্যাদি বহু জনহিত কাজ করে যান।

আলো-ছায়া
ধনী সম্প্রদায়ের বাঙালি জাতি শুধুই বিলাসিতায় ডুবে থাকতো না। দুর্গাচরণ এর মত বণিক সমুদ্র বাণিজ্যের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দান ধ্যানে বহু খ্যাতি লাভ করেন। বাঙালি ব্যাবসা পারে না এটা ভুল প্রমাণ করে দেন।
রক্ষিত বাড়ির পাশেই বাঙালির গৌরবময় অতীতের আরেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও সমাজসেবী ভোলানাথ দাসের বাড়ি। নারীশিক্ষার প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। লালবাগান বালিকা বিদ্যালয় একশো বছর পেরিয়ে গেছে। যা প্রথমে ভোলানাথ দাসের বাড়িতে মেয়েদের শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়টি চালু হয়। পরবর্তীতে ফরাসী গভর্নরের স্ত্রী মাদাম জুভান দানপত্র করে দেন স্কুলের জমিটি। ফরাসি সরকারের সহায়তায় প্রথম বাংলা মাধ্যম স্কুলটি পরিচালিত হত। ভোলানাথ দাসের নামে একটি রাস্তাও আছে চন্দননগরে।

নন্দদুলাল মন্দির
১৮ শতকে লালবাগানে দোচালা রীতিতে নির্মিত টেরাকোটা অলংকরণের নন্দদুলাল মন্দিরটি বিখ্যাত। ফরাসি সরকারের দেওয়ান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী মন্দিরটি নির্মাণ করেন। ১৭৫৬ সালে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে ক্লাইভের সৈন্য চন্দননগর আক্রমণ করে। তখন একটি গোলা মন্দিরে এসে পড়েছিল।

নন্দদুলাল মন্দিরের অদূরেই শ্রী শ্রী গোপীনাথ জীউ মন্দির। দুটি মন্দির একই সময়ে নির্মিত। গোপীনাথ জীউয়ের সঙ্গে একটি রাসমঞ্চ দেখা যায়। আম বাগান, রংবেরঙের ফুল গাছ, সুপুরি বাগান, পুরনো ভাঙ্গা পাঁচিল, কাঠের দরজা, ভিতর-বাহির উঠোন এখানকার সহজ সরল চিত্র। এর মধ্যেই অনেকখানি ইতিহাস বিধৃত হয়েছে।









