Home / প্রবন্ধ / রোববারের লেখা / চৈতন্যলীলার ভাস্কর্য সাক্ষাৎ ঈশ্বরাবেশ

চৈতন্যলীলার ভাস্কর্য সাক্ষাৎ ঈশ্বরাবেশ

ষড়ভুজ চৈতন্য, জয়পুর বাঁকুড়া

মুকুট তপাদার

ফাল্গুন মাসে দোল বা গৌরপূর্ণিমায় শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব। বাংলার পথে প্রান্তরে আজও মহাপ্রভুর স্মৃতি রয়ে গিয়েছে। এই মহামানব ষোড়শ শতাব্দীতে গণসংকীর্তন ও প্রেমভক্তি সকল জাতির মধ্যে বিলিয়েছেন। বঙ্গে সুলতানি প্রভাবের বিপরীতে গিয়ে হিন্দু মুসলমানকে এক সূত্রে বেঁধেছিলেন। তাঁর ভক্তির অঙ্কুরোদগম বঙ্গে, আর পূর্ণ লীলার প্রকাশ ঘটে নীলাচলে। কৃষ্ণনাম বহুমানিত সন্ন্যাসীর ধ্যান-জ্ঞান-প্রেম।

ভগ্ন পোড়ামাটি কাজে ষড়ভুজ চৈতন্য, হুগলি

লোকমতে, কলিযুগে লীলাবতার শ্রীচৈতন্যদেব নরদেহে স্বয়ং পরমেশ্বর রূপে আবির্ভূত। বাংলার মন্দির স্থাপত্যে পোড়ামাটি শিল্পে তাঁর একটি বিশেষ দিব্য স্বরূপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। রাঢ় বাংলার বহু মন্দির অলঙ্করণ হিসেবে বৈষ্ণব ভাবাপন্ন রূপটি প্রাধান্য পেয়েছে।

গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে পঞ্চম শতাব্দীতে তিন মাথার এক বিষ্ণুর মূর্তি পাওয়া যায়। প্রত্ন গবেষকরা দাবি করেন এটি বিষ্ণুর বিশ্বরূপ। মূর্তিরূপের বিচারে আদিতম। বিষ্ণুর সঙ্গে নৃসিংহ ও বরাহের মূর্তি খোদিত। মহাভারতের সময়, যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর বিশ্বরূপ প্রদর্শন করেছিলেন। অর্জুনকে দিব্যদৃষ্টি দেন শ্রীকৃষ্ণ, বিশ্বরূপের মধ্যেই সম্পূর্ণ জগৎ নিহিত রয়েছে।

নদিয়াবিহারী শ্রীচৈতন্যদেব একাধিকবার লীলাকালে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিশ্বরূপ প্রকাশ করেন। তিনি ত্রেতাযুগের শ্রীরামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ ও চৈতন্যরূপের সংমিশ্রণে ঐশ্বরিক যে মহিমা দর্শন করিয়েছিলেন তা হলো ‘ষড়ভুজ’ রূপ। যা বঙ্গের মন্দির স্থাপত্যতে পোড়ামাটি অলঙ্করণে ব্যবহার করা হতো।

ষড়ভুজ চৈতন্য, দে পাড়া বাঁকুড়া

শ্রীধাম নবদ্বীপে শ্রীবাস পণ্ডিতের বাসভবন। শ্রীবাস অঙ্গনে প্রতিদিন শ্রীচৈতন্য নাম-সংকীর্তন করতেন। সঙ্গে থাকতেন নিত্যানন্দ ও তাঁর পার্ষদগণ। মহাপ্রভু শ্রীবাসকে বলতেন, ‘তোমার গৃহে কদাপি দারিদ্র্য হবে না।’ একদিন এই গৃহেই মহাপ্রভুর মহা-প্রকাশ ঘটে। তাঁর ছয়টি হাতের দুই হাতে শ্রীকৃষ্ণর সম্মোহিনী বাঁশি। অন্য দুই হাতে শ্রীরাম রূপি ধনুর্বাণ ও বাকি দুই হাতে দণ্ড ও কমণ্ডলু। যা সন্ন্যাসের প্রতীক।

নীলাচলে ন্যায়শাস্ত্রের পণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌম এককথায় মহাপ্রভুর মধ্যে সচল জগন্নাথ দেখেছিলেন। সেই টানে মধ্যযুগীয় ভক্তি আন্দোলন ও হরিনামের জোয়ারে বঙ্গ থেকে দলে দলে তীর্থযাত্রীরা নীলাচলে যেতেন। বাসুদেব সার্বভৌম ঠাকুর স্বয়ং একদিন চৈতন্য দেহে ষড়ভুজ রূপ দর্শন করেছিলেন।

নীলাচলে গৌড়ের সন্ন্যাসী জীবনের অন্তিমে তখন হরিনামে আত্মহারা। জাত-পাত নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক জাগরণ এনেছেন। তিনি গম্ভীরা থেকে বেরিয়ে জগন্নাথ মন্দিরে দারুবিগ্রহে লীন হয়েছেন অথবা জগন্নাথ মন্দির ও গুণ্ডিচা মন্দিরের মাঝে প্রাচী নদীর তীরে পাণ্ডাদের দ্বারা খুন হয়েছেন, এমন বহু তথ্য ওড়িয়া সাহিত্যে পাওয়া যায়। সেই নদীকে বৈষ্ণব সাহিত্যে গঙ্গা বলা হতো। তিনি ভাবাবেশে সাগরে ঝাঁপ দিয়েছিলেন সেই তত্ত্ব বর্ণিত হয়। অতীতে রথযাত্রার সময় ছয়টি রথ হতো। মন্দির থেকে তিনটি রথে চড়ে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার বিগ্রহ নৌকায় নদী পেরিয়ে অপর তিনটি রথে চড়তেন। সেই নদী আজ মহাপ্রভুর মতন অন্তর্হিত।

উড়িষ্যার রাজা প্রতাপরুদ্র মহাপ্রভুর পরম ভক্ত ও শিষ্য ছিলেন। তিনিও ষড়ভুজ রূপের দর্শন পেয়েছিলেন। কথিত, মহাপ্রভুর রহস্যময় অন্তর্ধানের পর রাজা নীলাচল ত্যাগ করেন। মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ পার্ষদ সঙ্গী নিত্যানন্দ প্রভুও ষড়ভুজ রূপের দর্শন লাভ করেন।

ষড়ভুজ চৈতন্য, মানকরের লবণধর গ্রাম

স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন পোড়ামাটি ফলকে শ্রীচৈতন্য লীলার ষড়ভুজ ভাস্কর্যফলক। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ার জয়পুর, বিষ্ণুপুর, বর্ধমানের মানকর, হুগলির বিভিন্ন মন্দির বিখ্যাত পোড়ামাটির ষড়ভুজ চৈতন্য নিদর্শনের জন্য। স্থাপত্যের অলংকরণে হাতে খোদাই কাজটি এক মূল্যবান সম্পদ। পোড়ামাটি জানে ক্ষয়, স্থাপত্যের নিদর্শন ও ভাস্কর্যফলকগুলো সংরক্ষণ আবশ্যক। পথের পাশে উঁচু ভিতের ওপর আবার কোথাও ঝোপ জঙ্গলে ঘেরা ধাপের ওপর স্থাপত্যর মধ্যে সব ভাস্কর্যফলক কোনভাবে আজ টিকে। দেখলে মনে হয়, কোন চিত্রকরের হাতের ছোঁয়ায় ফুটে ওঠা অপরূপ ছবি। ইতিহাসের সঙ্গে বঙ্গের প্রাচীন মন্দির স্থাপত্যের নিদর্শনগুলো আজও মাথা উঁচু করে সাক্ষ্য বহন করছে।

তথ্যসূত্র: ড. দীনেশচন্দ্র সেন/ চৈতন্যমঙ্গল, লোচনদাস/ নগেন্দ্রনাথ মিত্র

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *