Home / প্রবন্ধ / রোববারের লেখা / প্রত্নচর্চার ক্ষেত্র: হুগলির মণ্ডলাইয়ে উদ্ধার প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি

প্রত্নচর্চার ক্ষেত্র: হুগলির মণ্ডলাইয়ে উদ্ধার প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি

মুকুট তপাদার

পুকুর সংস্কার করার সময় উদ্ধার হলো হাজার বছরের বেশি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি। জানা যায়, একটি জেসিবি খননকারী মেশিন দিয়ে খননকার্য চলছিল ওই পুকুরটিতে। সেই সময় পুকুর থেকে পাওয়া যায় বিরল মূর্তিটি।

জানা গিয়েছে, কিছুদিন ধরেই খনন চলছিল মণ্ডলাই গ্রামে পুকুরটিতে। সেই সময় পুকুর থেকে পাওয়া যায় এক প্রাচীন মূর্তি। সেই মূর্তিটি পাওয়ার পর বিষ্ণুমূর্তি বলেই মনে করেন গ্রামবাসীরা। এরপর তাঁরা মূর্তিটিকে সযত্নে তুলে পরিষ্কার করে স্থানীয় এক মনসা মন্দিরে রাখেন। এদিকে মূর্তি উদ্ধারের খবর পৌঁছতেই বহু দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ গ্রামে এসে মনস্কামনা পূরণের আশায় দর্শন করে পুজো দিচ্ছেন। এখনও প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগে এই খবর পৌঁছায়নি। ঘটনাটি ঘটেছে হুগলি জেলার পান্ডুয়া ব্লকের মণ্ডলাই গ্রামে।

উদ্ধার হওয়া বিষ্ণু মূর্তিটি দেখে মনে হয় একাদশ-দ্বাদশ শতকের। কালো ব্যাসল্ট পাথরে খোদিত দণ্ডায়মান মূর্তিটি। মূর্তিতে পাথরের কারুকার্য রয়েছে। মূর্তিতত্ত্বের বিচারে উপরের ডান হাতে আছে গদা এবং বাম হাতে আছে চক্র। নিচের হাতে পদ্মফুল। আর অন্য হাতে শঙ্খ। মাথায় সুদৃশ্য মুকুট। বিষ্ণুর দুই পাশে তাঁর দুই স্ত্রী লক্ষ্মী ও সরস্বতী আছেন। আবার শ্রীদেবী অর্থাৎ লক্ষ্মী আর ভূদেবী মানে বসুন্ধরা। তাদের এই নামকরণেও ডাকেন দক্ষিণ ভারতে। এই দুই দেবীর মূর্তি দেখতে পাওয়া যায় বিষ্ণুমূর্তির সঙ্গে। বিষ্ণু পালনকর্তা। পাথর খোদাইয়ের সূক্ষ্ম রীতি বিচার করলে একে অনায়াসেই দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর পাল ও সেন আমলের শিল্পশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। মণ্ডলাই গ্রামের পশ্চিম পাড়া মা মনসা মন্দিরে মূর্তিটিকে রাখা হয়েছে। নিত্য চলছে পূজোপাঠ।

ইলছোবা ও মণ্ডলাইয়ে মাটি খুঁড়লে প্রায়শই বেরিয়ে আসে কষ্টিপাথরের প্রাচীন দেব-দেবী বা ভাস্কর্য, যা স্থানীয় বিশ্বাসে পুজো পায়। এই মূর্তিগুলো পাল ও সেন যুগের সাক্ষী বহন করছে। রাঢ় অঞ্চলসহ বাংলার গ্রামীণ এলাকায় একসময় বহু বিষ্ণুর পাথুরে মন্দির ছিল। পাদপীঠের ওপর সোজা দাঁড়িয়ে থাকা বিষ্ণুর মূর্তি নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, বাংলার ভাস্কর্য শিল্পের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। যাকে ‘স্থানক’ মূর্তি বলা হয়। মণ্ডলাই গ্রামের পাশে ইলছোবার দাস বংশের পোড়ামাটির জোড়া পঞ্চরত্ন মন্দিরেও একটি চতুর্ভুজ স্থানক বিষ্ণু মূর্তি পাওয়া যায়। বাংলা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যে সকল মূর্তি উদ্ধার হয়েছে তার বেশিরভাগে এই লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট দেখা যায়। বিষ্ণু মূর্তিটি পাদপীঠের ওপর দাঁড়িয়ে। দাস বংশ মূর্তিটির নিত্য পুজো করেন।

প্রাচীন বাংলার গ্রাম কেন্দ্রিক জনপদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির উপাদান। প্রাচীনকালে হুগলি জেলার পান্ডুয়া মূলত ছিল দক্ষিণ রাঢ়। আঞ্চলিক চেতনায় রাঢ় ভূমিতে পাল ও সেন পর্বে পাথরের ভাস্কর্যের প্রচুর নিদর্শন নানা দিক থেকে পাওয়া গিয়েছে। একাদশ দ্বাদশ শতকে মূর্তি নির্মাণে বিবর্তন চোখে পড়ে। দেহসজ্জা ও নানা অলংকারে শিল্পের প্রমাণ সেদিকেই নির্দেশ দেয়। মূর্তি কলায় প্রচুর অলংকরণ সুস্পষ্ট থাকে। বারো শতকে গৌড়ের রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি জয়দেবের গীতগোবিন্দের সাহিত্য রসের প্রভাব মূর্তি কলার ওপর পড়েছিল।

প্রাচীন মূর্তিগুলো মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরীক্ষার মাধ্যমে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ওই সকল এলাকা থেকে প্রাচীন মূর্তির আরো সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *