Home / প্রবন্ধ / রোববারের লেখা / চাঁদের আলোয় তুষার পুড়তে থাকে

চাঁদের আলোয় তুষার পুড়তে থাকে

বরানগরে নড়াইল রাজবাড়ির প্রবেশপথ

মুকুট তপাদার

পুরনো বাঁধন ছিঁড়ে নতুনের পথে পথচলা। সময়টা ছিল রক্তের, ক্ষুধার, বিদ্রোহের। পেটে খিদে, মুঠোয় জমে ওঠে ক্ষোভ। শহরের এক পাতা বুলেটিনে বিদ্রোহের অনামা হাত লিখে যায়। যারা ধুলোর তলায়, শব্দের বাইরে, তাদের নামেই শুরু হয়েছিল লেখা। অস্বস্তির মতো ধারালো হোক শব্দ। পাঠকের বুকে বিঁধুক প্রশ্ন। জ্বলে উঠুক নিঃশব্দ চিন্তা। ক্লান্ত মন? সাহিত্যের জলে ধুয়ে যাক সে মন। কিন্তু সেই জলেও থাকুক বারুদের গন্ধ।

ওরা লিখেছিল শ্মশানের ছাইয়ে, ভাটিখানার ধোঁয়ায়, শিয়ালদা স্টেশনের ভিড়ে। ছবি প্রদর্শনীর পর শেষ দিনে ধরিয়ে দিয়েছিল সব ছবিতে আগুন। পুঁজির দরজায় কড়া নয়, হাতুড়ির আঘাত। সব শেষ করে নতুন করে শুরু করেছিল। হাংরিয়ালিস্ট কবি ফালগুণী রায়ের দাদা কবি তুষার রায়। অভাবে তাঁর স্বপ্ন নিভেছিল।

সত্তরের ঝোড়ো দশকের সেই অকালপ্রয়াত নক্ষত্র কবি তুষার রায়। জ্বলে উঠেছিলেন হঠাৎ যেভাবে, আর সেভাবে নিভে গেলেন দ্রুত। মাত্র তেতাল্লিশের সীমায় থেমে যাওয়া তাঁর জীবন। তাঁর অপরিসীম কবিমানস। পাঠকের হৃদয়ে আজও তাঁর সহজ অধিকার।

কবি তুষার রায়

তাঁর ভাষার স্বতন্ত্রতা যেন হাংরিয়ালিস্টদেরকে পরবর্তীতে ভাবতে বাধ্য করে। আর জীবনকে দেখার একান্ত, একাকী, অথচ অদম্য কবি প্রতিভা।

দারিদ্র্যের আঁধারে ঢেকেছিল তুষার রায়ের দিনকাল। ক্ষুধার জ্বালায় ক্লান্ত শরীর, তবু কলম থামেনি। কলকাতার রাস্তায় গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়তেন। গাড়ি থেমে যেতো। মৃত্যুকে ভাবতেন আপন স্নেহের মতো।

অভাব এসে দাঁড়াল নিঃশব্দে ভাঙা প্রাসাদে। বরানগরে নড়াইল রাজ পরিবারের সন্তান কবি তুষার রায়। বাবু রতন রায় ছিলেন তাঁর প্রপিতামহ। এদিকে দেশভাগ, স্বপ্ন বাঁচে নীরবে প্রাসাদের এক কোণে। ভাঙা প্রাসাদে শুধুই অর্থ অভাব।

যশোরের সঙ্গে সমস্ত ব্যবসা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দেশভাগের ক্ষত বুকে। জমিদার বাড়ির আঙিনায় নেমে এলো চরম অভাব। তবু যাতায়াত ছিল কফি হাউজে। প্রায় শেষ দিন অবদি আড্ডা জমত।

মাঝপথ থেকেই শুরু হতো কবিতা পড়া, তেমনই চল ছিল। জীবনের ছবি যেমন অগোছালো। কবি তুষার রায় লিখেছিলেন, “যে কোন ফানুস আমি ওড়াতে চাই/কেনোনা শূন্যমনে তারপর ফিরে আসা যায়।”

‘দেখে নেবেন’ কবিতায় লিখলেন, “বন্ধুগণ গনগনে আঁচের মধ্যে/ শুয়ে এই শিখায় রুমাল নাড়া/ নিভে গেলে, ছাই ঘেঁটে দেখে নেবেন/ পাপ ছিল কিনা”।

কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর ব্যাণ্ডমাস্টার খ্যাত কবি তুষার রায় ময়দানের মেলায় বলেছিলেন, “পুলিশ, কবিকে দেখে টুপিটা তুই খুলিস।”

এক সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে বরানগরে অনাড়ম্বরভাবে তাঁর শ্মশানযাত্রা হয়। অনটনের দীর্ঘ পথ দারিদ্র্য শরীরটাকে ক্লান্ত করেছিল কিন্তু কবিতাকে নয়।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *