মুকুট তপাদার
বরাহনগর তখন ওলন্দাজদের ঘাঁটি। গঙ্গার তীর ধরে ছোট বড় বিদেশি নৌকার আগমন। জায়গাটির পাট উৎপাদনের কেন্দ্র ছিল। একরকম বলতে গেলে নগরে ব্যবসায়ীক কেন্দ্র ও বড় বাজার গড়ে ওঠে। বড়-মাঝারি-সচ্ছল-দরিদ্র ও অভাবগ্রস্থ সবরকম মানুষকে নিয়েই বাস। ওলন্দাজ সাহেবসুবো, ওলন্দাজদের ফ্যাক্টরি, জমিদারি, খাজনা আদায়, ঝি-চাকর, ঠেলাওয়ালা, গঙ্গার ধারে কত মন্দির নিয়ে এযেন পুরনো বরানগরের চিত্র। তবে, ফিরে যেতে হবে তারও দুশো বছর আগে। ওই সময় মধ্যযুগীয় সাহিত্যতে এখানকার নাম ছিল। প্রাচীন নগরটিতে তখন গড়ে ওঠে শ্রীচৈতন্যদেবের এক লীলাক্ষেত্র।
সুপ্রাচীন জনপদ বরাহনগর মহাপ্রভুর পাদস্পর্শে ধন্য হয়েছিল। ভাগবতাচার্য রঘুপন্ডিতের গৃহে তিনি বাস করেছিলেন। ১৫১২ সালে চৈতন্যদেব পানিহাটি থেকে নৌকায় বরানগর এসে পৌঁছালেন। শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবতে উল্লেখ আছে যে তিনি পানিহাটি গ্রাম ধন্য করে এখানে আসেন জ্ঞান ও প্রেমের বাণী প্রচারে। বহু মানুষকে হরিনাম সংকীর্তনে বাঁধলেন। সেই উপলক্ষে ২০২৬ সালটি হল তাঁর ৫১২তম সুভাগমন দিবস।
“শ্রীল ভগবত আচার্যের ঘরে
প্রাণ গৌর নাচে প্রেমভরে”…
সমগ্র বাংলা জুড়ে তখন ধর্মীয় রেনেসাঁস আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। চৈতন্যদেবের আগমনে এই জায়গাটিতে লীলাক্ষেত্র তৈরি হলো। তামাম বাংলায় তখন হোসেন শাহের আমল। গৌড়-লখনৌতির সুলতানকে মহাপ্রভু নিজের অন্যতম শরিক করে নিয়েছেন। উদারপন্থী সুলতানের সময় পানিহাটি ও বরাহনগরে মহাপ্রভুর আগমন ঘটেছিল।
রঘু পন্ডিত নিজে প্রথমবার মহাপ্রভুর দর্শন পেয়েছিলেন নবদ্বীপধামে। রঘু পন্ডিত নিজের গোপাল বিগ্রহকে সঙ্গে করে নবদ্বীপের শ্রীবাস অঙ্গনে পৌঁছালেন। সেখানে তখন চাঁদের হাট। শ্রীঅদ্বৈত, মুরারী, হরিদাস, মুকুন্দ, শ্রীবাস পণ্ডিত, নিত্যানন্দ প্রভু সহ মহাপ্রভু কীর্তন করছেন। রঘুপণ্ডিতের পরিচয় পেয়ে সকলেই তাকে যথাযথ আপ্যায়ন করলেন। কীর্তন শেষে পরের দিন প্রভাতে মহাপ্রভু স্বয়ং রঘু পণ্ডিতকে শ্রীকৃষ্ণমন্ত্র দেন। আর ভাগবতের একটি বঙ্গানুবাদ করবার আদেশ দেন। মহাপ্রভু ছিলেন সর্বশাস্ত্রজ্ঞ। রচনা করেন ‘শিক্ষাষ্টক’ ও ‘শ্রীশ্রীজগন্নাথষ্টকম’। প্রভু স্বয়ং ভাগবতাচার্য্য রঘু পন্ডিতকে বলেন, “বরাহনগরে আমি তোমার গৃহে যাবো।” চৈতন্য মহাপ্রভুর একজোড়া পাদুকা শ্রীপাট বরাহনগরে রাখা আছে।

বরাহনগরে প্রশস্ত নাটমন্দির, কীর্তনমণ্ডপ, টোল, মন্দির স্থাপত্যে চৈতন্য সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছিল। বরাহনগরে শ্রীচৈতন্যের পদধূলিধন্য ৫১২তম সুভাগমন উৎসবে বহু পুণ্যার্থীরা যোগ দেন। বরাহনগর জুড়ে উৎসবের আমেজ। ১৬ প্রহরব্যাপী নাম সংকীর্তন হয়। এই মহোৎসবে সংকীর্তনের মাধ্যমে নগর পরিক্রমা করা হয়। প্রাচীন এই উৎসবে অসংখ্য বৈষ্ণব ধর্মাম্বলী পুণ্যার্থীদের সমাগম হয় শ্রীপাটে। মহোৎসব ঘিরে চলে ধর্মসভা ও পূজার্চনা। দিনভর চলে মহাপ্রভুর সেবাপুজো।









