Home / প্রবন্ধ / একক আধিপত্যের পথে বিজেপির ঐতিহাসিক উত্থান বিহারে

একক আধিপত্যের পথে বিজেপির ঐতিহাসিক উত্থান বিহারে

অমল মাজি

এখন এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বিহারের রাজনীতি। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নীতীশ কুমার যেভাবে জোটের রাজনীতি আর পাল্টি খাওয়ার কৌশলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন, এ বার সেই জমানার অবসান হতে চলেছে। বিধান পরিষদের সদস্যপদ থেকে তাঁর আকস্মিক ইস্তফা এবং আগামী ১০ এপ্রিল রাজ্যসভায় যাওয়ার প্রস্তুতি আসলে রাজ্য় রাজনীতিতে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা হারানোরই চূড়ান্ত স্বীকৃতি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নীতীশ কুমার এখন এক প্রকার বাধ্য হয়েই বিহারের রঙ্গমঞ্চ থেকে বিদায় নিচ্ছেন, কারণ তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছে। গত ২০ বছর ধরে তিনি ক্ষমতার অলিন্দে থাকলেও বিহারের সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধান বা রাজ্যের প্রকৃত শিল্পায়নে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। নীতীশ কুমারের এই জনবিচ্ছিন্নতা এবং নীতিহীন রাজনীতির সুযোগ নিয়ে বিজেপি এখন দীর্ঘ ৫০ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে চলেছে। দল গঠনের পর এই প্রথম বিহারে একক শক্তিতে নিজেদের মুখ্যমন্ত্রী বসাতে যাওয়া বিজেপির জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক জয় নয়, তার থেকেও বেশি কিছু। কার্যত নীতীশের ‘সুবিধাবাদী রাজনীতি’র বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত মোক্ষম আঘাত।

নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক পতনের সবচেয়ে বড় কারণ হল তাঁর দ্বিমুখী আচরণ। গত দুই দশকে তিনি বারবার আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করেছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন। বিশেষ করে বিহারের প্রায় ৩৬ শতাংশ ‘অতি অনগ্রসর’ বা ইবিসি (EBC) ভোটব্যাঙ্ককে তিনি দীর্ঘকাল নিজের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মহান জননেতা কর্পূরী ঠাকুরের যোগ্য উত্তরসূরি হওয়ার দাবি করলেও, নীতীশ তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে এই অত্যন্ত অনগ্রসর সমাজ থেকে কোনো শক্তিশালী বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে উঠতে দেননি। তিনি সবসময়ই সচেতনভাবে এমন কাউকে সামনে আসতে দেননি যিনি তাঁর গদিতে ভাগ বসাতে পারেন। বিজেপি এখন নীতীশের এই সংকীর্ণ রাজনীতির ক্ষততেই সরাসরি প্রলেপ দিতে চাইছে। সম্রাট চৌধুরী বা বিজয় কুমার সিনহার মতো অভিজ্ঞ নেতাদের নাম মুখ্যমন্ত্রী পদের লড়াইয়ে থাকলেও, কেন্দ্রীয় নেতারা চমক দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর লক্ষ্য হল বিহারের সেই বঞ্চিত অতি অনগ্রসর বা দলিত সমাজ থেকে এমন একজনকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে আনা, যিনি সরাসরি দিল্লির উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সুবিধা মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দেবেন। মধ্যপ্রদেশ বা রাজস্থানে যেভাবে তারা প্রথাগত সমীকরণ ভেঙে নতুন মুখ এনেছেন, বিহারেও সেই একই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে গেরুয়া শিবির।

বর্তমানে জেডিইউ-র অবস্থা অত্যন্ত নড়বড়ে। নীতীশ কুমার নিজে সম্রাট চৌধুরীর নাম পছন্দ করলেও, বিজেপি এখন আর তাঁর পছন্দের তোয়াক্কা করার প্রয়োজন মনে করছে না। কারণ নীতীশের রাজনৈতিক প্রভাব এখন তলানিতে ঠেকেছে। নীতীশের দিল্লি যাত্রা এবং রাজ্যসভায় যাওয়া আসলে তাঁর জন্য এক নিরাপদ প্রস্থান পথ ছাড়া আর কিছুই নয়।

বিহারের মতো জটিল জাতপাতের রাজ্যে এতদিন উচ্চবর্ণ বা ওবিসি নেতৃত্বের দাপট থাকলেও, বিজেপি এখন সরাসরি অতি অনগ্রসর ও দলিতদের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে চাইছে। এই কৌশল সফল হলে শুধু নীতীশ কুমারই নন, বিহারের পুরো বিরোধী শিবিরের রাজনীতিও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং জাতপাতের রাজনীতি থেকে বিহারকে মুক্ত করে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলাই এখন বিজেপির প্রধান লক্ষ্য।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *