Home / প্রবন্ধ / বিজেপি ভাবছে এসআইআর-এ ‘ভুয়ো’ ভোট বাদ গেলে কুপোকাত হবে তৃণমূল, কোন অংকে?

বিজেপি ভাবছে এসআইআর-এ ‘ভুয়ো’ ভোট বাদ গেলে কুপোকাত হবে তৃণমূল, কোন অংকে?

অমল মাজি, একজিকিউটিভ এডিটর, কোলফিল্ড টাইমস

বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর এখন রাজ্য রাজনীতির মূল চর্চার বিষয়। বিজেপি নেতাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, রাজ্যে বিপুল সংখ্যক ‘ভুয়ো’ বা জাল ভোটার রয়েছে, যারা নির্বাচনের ফলাফলকে তৃণমূলের পক্ষে প্রভাবিত করে। এখনও পর্যন্ত এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ২৫ লক্ষ ভোটারের তথ্যে অসঙ্গতি দেখা গেছে। গেরুয়া শিবির মনে করছে, এই জাল ভোটগুলো তালিকা থেকে বাদ গেলে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্কে বড় ধস নামবে এবং নির্বাচনী সমীকরণ বিজেপির অনুকূলে চলে আসবে। কোন অংকে এমনটা ভাবছে বিজেপি?

ভোটের ব্যবধান বনাম জাল ভোটারের সংখ্যা

বিজেপি শিবিরের দাবি, গত লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে ভোটের যে ব্যবধান ছিল, এসআইআর প্রক্রিয়ায় চিহ্নিত অসঙ্গতিপূর্ণ ভোটারের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী গত দুটি বড় নির্বাচনের পরিসংখ্যান কতকটা এ রকম-

২০২৪ লোকসভা নির্বাচন: ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে আসনের দিক থেকে তৃণমূল ৪২টির মধ্যে ২৯টি জিতেছিল আর বিজেপি মাত্র ১২টি আসন পায়। আসনে পার্থক্য মোট ১৭টি। ২০১৯ সালের নির্বাচনের তুলনায় সেবার খারাপ ফল করেছিল বিজেপি। ২০১৯-এ তৃণমূল ২২টি আসন পেয়েছিল এবং বিজেপি ১৮টি আসন পেয়েছিল। তৃণমূলের আসন সংখ্যা ২০২৪-এ বেড়েছে, আর বিজেপির সংখ্যা কমেছে। তবে পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল প্রায় ৪৬.১৬ শতাংশ ভোট এবং বিজেপি পেয়েছিল ৩৮.০৮ শতাংশ। দুই দলের মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের পার্থক্য ছিল প্রায় ৮.০৮ শতাংশ। ভোটের সংখ্যায় এই ব্যবধান ছিল প্রায় ৪২ লক্ষ ৪৩ হাজার।

২০২১ বিধানসভা নির্বাচন: ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল আবারও ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল ঠিকই, বিজেপি আগের তুলনায় অনেক বেশি আসন পায়। ওই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২১৩টি আসন জেতে এবং বিজেপি পায় ৭৭টি আসন। ফলে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে আসনের পার্থক্য ছিল ১৩৬টি আসন। সেবার বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল পেয়েছিল ৪৭.৯৪ শতাংশ ভোট এবং বিজেপি ৩৮.১৪ শতাংশ। সেবার দুই দলের ভোটের পার্থক্য ছিল প্রায় ৯.৮ শতাংশ, যা সংখ্যায় প্রায় ৬০ লক্ষ ৬৩ হাজার।

বিজেপি নেতাদের দাবি, বর্তমানে এসআইআর-এর মাধ্যমে যে ১ কোটি ২৫ লক্ষ ভোটারের নাম ‘সন্দেহজনক’ তালিকায় রাখা হয়েছে, তার একটা বড় অংশ যদি শেষ পর্যন্ত বাদ যায়, তবে তৃণমূলের লিড বা ব্যবধান মুছে ফেলা সম্ভব। বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা এবং সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে যেখানে ভোটার তালিকায় ব্যাপক অসঙ্গতি মিলেছে, সেখানে ফল আমূল বদলে যেতে পারে বলে আশা করছে বিজেপি।

এসআইআর প্রক্রিয়া এবং বর্তমান পরিস্থিতি

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনকে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যাতে এই ১.২৫ কোটি ভোটারের নাম গ্রাম পঞ্চায়েত এবং ব্লক স্তরে জনসমক্ষে টাঙানো হয়। ভোটারদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে তাদের নথিপত্র জমা দিয়ে নাম বৈধ করার। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী ও দিলীপ ঘোষেরা বারবার দাবি করেছেন যে, তালিকায় প্রায় ১.৫ কোটি জাল ভোটার রয়েছে যার মধ্যে অনেক মৃত ব্যক্তি ও অনুপ্রবেশকারীর নাম ঢোকানো হয়েছে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস এই এসআইআর প্রক্রিয়াকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে আক্রমণ করেছে। শাসক দলের দাবি, প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে বিজেপি পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে। তাদের মতে, ভোটার তালিকায় নাম সংশোধন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং এটাকে জাল ভোট বলে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর।

সত্যিই যদি এসআইআর-এর চূড়ান্ত তালিকায় ১ কোটির বেশি নাম বাদ যায়, তবে তা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা হবে। গাণিতিক হিসেবে, গত লোকসভা ভোটে তৃণমূল-বিজেপির ৪২ লক্ষের ব্যবধান ১.২৫ কোটি ভোটারের রদবদলে অনায়াসেই বিলীন হয়ে যেতে পারে। সম্ভাবাবে ১ কোটি ২৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়লে তার একটি বড় অংশ তৃণমূলের তথাকথিত ‘সংগঠিত ভোটব্যাঙ্ক’-এর মধ্যে পড়তে পারে বলে বিজেপির ধারণা। যদিও এই দাবিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রচার বলেই উড়িয়ে দিয়েছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। শাসক দলের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে কোনো বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া যাবে না। এই দাবি প্রথম থেকেই জানিয়ে আসছে তৃণমূল। কিন্তু কত নাম বাদ গেল আর তার থেকে তৃণমূলের কত ভোট কমলো, তা নিয়ে অযথা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের সংখ্যা এখন প্রায় ৭ কোটি ৫০ লক্ষের কাছাকাছি। যদি এসআইআর প্রক্রিয়ায় সত্যিই ১ কোটি ২৫ লক্ষ নাম বাদ পড়ে, তাহলে তা মোট ভোটারের প্রায় ১৬ শতাংশ। এত বড় অংশের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া যে কোনও নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। শেষ দুই বড় নির্বাচনের পরিসংখ্যান দেখলে স্পষ্ট যে তৃণমূল ও বিজেপির ভোটের ব্যবধান কয়েক লক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে ভোটার তালিকায় বড় রদবদল হলে তার প্রভাব নির্বাচনী সমীকরণে পড়তেই পারে।

এ ছাড়া বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলা, যেমন উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মালদহ এবং নদীয়া-তে ভুঁয়ো বা ডুপ্লিকেট ভোটারের সংখ্যা বেশি। বিজেপির দাবি, এই জেলাগুলিতে ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা হলে তৃণমূলের সংগঠিত ভোটব্যাঙ্কে ধাক্কা লাগতে পারে। পাশাপাশি, রাজ্যে তৃণমূলের ভোটের বড় অংশ গ্রামাঞ্চল ও দরিদ্র শ্রেণীর ভোটারদের মধ্যে কেন্দ্রীভূত। ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে যদি এই অংশের ভোটারদের নাম বেশি করে বাদ পড়ে, তাহলে নির্বাচনী সমীকরণে বিজেপি তুলনামূলকভাবে লাভবান হলেও হতে পারে।

alternatetext
Tagged:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *